kalerkantho


চমেক হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগ

শিক্ষকতা-অভিজ্ঞতা ছাড়াই অধ্যাপক পদে পদোন্নতি!

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



শিক্ষকতা-অভিজ্ঞতা ছাড়াই অধ্যাপক পদে পদোন্নতি!

চিকিৎসা পেশায় এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে পদোন্নতির নজির নেই। কিন্তু বাংলাদেশ চিকিৎসা ও দন্ত চিকিৎসা পরিষদের (বিএমএন্ডডিসি) নিয়ম ভেঙে গ্যাস্ট্রোহিপাটো বিলিয়ারি সার্জারি বিভাগের এক সহযোগী অধ্যাপককে ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক-শিক্ষক জানান, অধ্যাপক পদে পদোন্নতির আগ পর্যন্ত ইউরোলজি বিষয়ে পাঠদানে ওই চিকিৎসকের এক দিনেরও অভিজ্ঞতা নেই। বিএমএন্ডডিসি নিয়ম অনুযায়ী সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য অন্যান্য শর্ত ও যোগ্যতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাঁচ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা আবশ্যক। এ ছাড়া অধ্যাপক হওয়া যায় না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি।

এ ছাড়া ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে সহযোগী অধ্যাপক এবং তার আগে সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদে পদোন্নতি পাওয়ার সময়ও অনিয়ম করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সবমিলে তিন দফাতেই পদোন্নতিতে নিয়ম মানা হয়নি বলে জানা গেছে।

অভিযোগ ওঠা এই চিকিৎসকের নাম গাজী মোহাম্মদ জাকির হোসেন। তিনি বর্তমানে চমেক হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

অভিযোগ উঠেছে, অনিয়ম করে তাঁকে গ্যাস্ট্রোহিপাটো বিলিয়ারি সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক থেকে ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এ কারণে চমেক হাসপাতালে গ্যাস্ট্রোহিপাটো বিলিয়ারি সার্জারি বিভাগটি স্থায়ী শিক্ষক শূন্য হয়ে পড়েছে। সাড়ে চার বছর আগে গাজী মোহাম্মদ জাকির হোসেনকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি নিয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জনসের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করা হয়েছিল। ওই চিকিৎসককে যোগদান করতে না দেওয়ার জন্য চমেক অধ্যক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে যোগদান করতে দেন।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জনসের ওই আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, ডা. গাজী মোহাম্মদ জাকির হোসেনকে গ্যাস্ট্রোহিপাটো বিলিয়ারি সার্জারির সহযোগী অধ্যাপক থেকে ইউরোলজি বিভাগে অধ্যাপক পদে পদায়নের বিষয়টি পদোন্নতি আইনের পরিপন্থী। তাঁর পদোন্নতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হলেও তিনি এখনো এই পদে বহাল রয়েছেন।

এদিকে চমেক হাসপাতালের চিকিৎসক ও শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক ডা. গাজী মোহাম্মদ জাকির হোসেনকে নিয়ে আবার তোলপাড় শুরু হয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে নিয়ে কলেজের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম একাডেমিক কাউন্সিলের সভা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে তাঁর কাছে বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাওয়া হবে বলে কলেজ সূত্রে জানা গেছে। ইউরোলজিতে অধ্যাপক হলেও তাঁর ওই বিষয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা না থাকায় তাঁকে ক্লাস নেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে বলে রুটিন প্রণয়নকারী কমিটির কর্মকর্তারা জানান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চমেক হাসপাতালের একাধিক শিক্ষক-চিকিৎসক জানান, একাডেমিক কাউন্সিল ডাকা হয় সাধারণত শিক্ষার্থী, ছাত্র সংগঠনের কোনো সমস্যা নিয়ে। অথবা কলেজে উদ্ভূত কোনো পরিস্থিতি ও কলেজ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে। এতে কলেজের অধ্যাপকরা থাকেন। কিন্তু অতীতে কোনো চিকিৎসকের বিষয়ে এই কাউন্সিল ডাকা হয়নি। অধ্যাপক ডা. গাজী মোহাম্মদ জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রথমবারের মতো এই  সভা অনুষ্ঠিত হয়। 

গ্যাস্ট্রোহিপাটো বিলিয়ারি সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক থেকে ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জনসের মহাসচিব সহযোগী অধ্যাপক ডা. শওকত আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাধারণত এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে যাওয়াটা নিয়মে পড়ে না। তবে এ রকম কোনো নিয়ম আছে কি না আমি জানি না।’ একই কথা জানিয়েছেন একই সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এস এ খান।

এ ব্যাপারে চমেক ইউরোলজি বিভাগের প্রধান ও চট্টগ্রাম বিএমএ সহসভাপতি ডা. মোহাম্মদ মনোয়ার-উল-হক শামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সর্বশেষ গত ১৯ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক আদেশে দেখা গেছে অধ্যাপকের শূন্য পদে পদোন্নতির জন্য ফিডার পদে (একাডেমিক) এবং এর আগে সহযোগী অধ্যাপক (নিয়মিত) পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের এসএসবির মাধ্যমে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির আবেদন করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ এই আবেদনেই উল্লেখ আছে ফিডার পদ হচ্ছে মূল পদ। পদোন্নতি পেয়ে যে বিষয়ে যিনি সহযোগী অধ্যাপক হয়েছেন তিনি ওই বিষয়ে অধ্যাপকের পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করতে পারবেন। এ ছাড়া বিএমডিসি নিয়ম আছে অধ্যাপক পদে আবেদন করতে হলে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাঁচ বছর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা লাগবে।’

ডা. মোহাম্মদ মনোয়ার-উল-হক শামীম আরো বলেন, কিন্তু ডা. গাজী মোহাম্মদ জাকির হোসেন ইউরোলজি বিষয়ে অধ্যাপক হয়েছেন ওই বিষয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছাড়াই। ইউরোলজি বিষয়ে ওনার ডিগ্রি থাকলেও এই বিষয়ে তিনি অধ্যাপক হওয়ার আগে কোনো পদোন্নতি পাননি।

বাংলাদেশ চিকিৎসা ও দন্ত চিকিৎসা পরিষদ (বিএমএন্ডডিসি) রেজিস্ট্রার ডা. মো. জাহেদুল হক বসুনিয়া বলেন, যে বিষয়ে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে ওই বিষয়ে যদি ডিগ্রি থাকে তাহলে কোনো সমস্যা নেই।’

গ্যাস্ট্রোহিপাটো বিলিয়ারি সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক থেকে ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক পদোন্নতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. গাজী মোহাম্মদ জাকির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই সময় শিক্ষক স্বল্পতার কথা বিবেচনা করে আমাকে সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।’

ইউরোলজি বিষয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছাড়া ওই বিষয়ে অধ্যাপক হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না। যাচাই-বাছাই করে আমাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।’

অধ্যাপক হওয়ার পর চমেক ইউরোলজিতে ক্লাস নিচ্ছেন কি না জানতে চাইলে ডা. গাজী মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’



মন্তব্য