kalerkantho


ভুয়া দলিলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র

কক্সবাজার রেললাইনের জন্য জমি অধিগ্রহণ

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণের টাকা হাতিয়ে নিতে ১৪ জনের একটি চক্র তৎপর। এরা ভুয়া খতিয়ান ও দলিল তৈরি করে ওই অপকর্ম করছে। এদের সঙ্গে অসাধু কিছু সরকারি কর্মচারীও জড়িত।

এদিকে চক্রটির বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন কক্সবাজারের ঝিলংজা ইউনিয়নবাসী। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে শত শত জমির মালিক মানববন্ধনে অংশ নেন। এরপর তাঁরা জালিয়াত ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেনকে স্মারকলিপি দেন। 

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দীর্ঘ ৭৬ বছর পর কক্সবাজারবাসীর প্রাণের দাবি রেললাইন নির্মাণ শুরু হচ্ছে। কিন্তু একটি দালালচক্র অধিগ্রহণের জমির ক্ষতিপূরণের টাকা হাতিয়ে নিতে অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ওই চক্রে সরাসরি ১৪ জন জড়িত। তাঁরা হলেন কক্সবাজার শহরের উত্তর তারাবনিয়ারছড়া এলাকার আবুল ফজলের ছেলে শামশুল হুদা ও শহিদুল হুদা, জানারঘোনা এলাকার মৃত ফজল আহমদের ছেলে নুরুল হক, নুরুল আমিন, সিরাজুল হক, নুরুল আবছার, হাজীপাড়া এলাকার আবদু ছাত্তার, পিএমখালী এলাকার মকবুল আহমদের ছেলে তৌহিদুল ইসলাম, জানারঘোনা এলাকার আমিন উল্লাহ, দক্ষিণ ডিককুল এলাকার মৃত ফজল আহমদের ছেলে ছৈয়দ আলম, পশ্চিম লারপাড়া এলাকায় মৃত মো. হাশেমের ছেলে আবু তালেব, আবদুচ ছালামের ছেলে মোহাম্মদ আমিন, ইসমাইলের ছেলে রুবেল ও মৃত নুর আহমদের ছেলে ইসমাইল।

ভুক্তভোগী আব্দুল হামিদ বলেন, ‘দালালচক্র ভুয়া খতিয়ান ও দলিল তৈরি করে নিজেদের নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এদের সঙ্গে অসাধু কিছু সরকারি কর্মচারীও রয়েছেন। এমনকি অধিগ্রহণের টাকা আত্মসাৎ করার জন্য ভুয়া জাল দলিলের মাধ্যমে দেওয়ানি আদালতে মামলা করে ভুয়া বিবাদী দেখিয়ে সোলেহনামার মাধ্যমে ২৭ দিনের মধ্যে রায় ডিক্রি হাসিল করে। ওই রায় ডিক্রিমূলে ১৩ দিনের মধ্যে নামজারি বিএস খতিয়ান সৃজন করে রাখে চক্রটি। এরপর ওরা খতিয়ান মূলে অধিগ্রহণের টাকা উত্তোলনের আবেদন করে।’

তিনি জানান, জমির প্রকৃত মালিক টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করলে জাল জালিয়াতের বিষয়টি ধরা পড়ে। এমনকি ওই চক্রের প্রধান শামশুল হুদা কলাতলী বাইপাস এলাকায় বিএস ১৭১৩১ দাগের সরকারি দুই একর খাসজমি সম্পূর্ণ প্রতারণা ও জাল দলিল সৃজনের মাধ্যমে দখল করে আত্মসাৎ করার চেষ্টা করেন। পরে সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাজিম উদ্দীন তা নস্যাৎ করে দেন।

জানা গেছে, ওই চক্রের সদস্যরা ইতোপূর্বে মহেশখালী কয়লা বিদ্যুৎ সংক্রান্ত এলএ মামলা হতে প্রতারণামূলক ভুয়া ব্যক্তি সাজিয়ে টাকাও উত্তোলন করে। একইভাবে কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজের জমি অধিগ্রহণের টাকাও প্রতারণামূলকভাবে ভুয়া মালিক সাজিয়ে টাকা উত্তোলন করে। পরে উত্তোলনের এই টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা সার্টিফিকেট মামলা দায়ের করেন। মামলাটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে।

এদিকে এ চক্রের তিন সদস্যাকে গত মঙ্গলবার আটক করেছে প্রশাসন। এ সময় ৬ বস্তা ভুয়া খতিয়ানসহ নকল ওয়ারিশ সনদের প্যাড, চেয়ারম্যান, কাউন্সিল ও মেয়রের সিল উদ্ধার করা হয়। আটক সদর উপজেলা পিএমখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ নয়াপাড়া এলাকার মকবুল আহমদের ছেলে তৌহিদুল ইসলাম, একই ইউনিয়নের মাইজপাড়া এলাকার আবুল কাশেমের ছেলে নুরুল আবছার ও লিংকরোডস্থ ছাদুর পাড়া এলাকার ছৈয়দুল হক বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান শহিদুল আলম বাহাদুর বলেন, ‘চক্রের অন্য সদস্যদের যদি দ্রুত সময়ে আইনের আওতায় আনা না হয় তাহলে জমির প্রকৃত মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ওরা এখনো সক্রিয়। এদের সাথে স্থানীয় এলএ অফিসের কিছু কর্মচারী জড়িত রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না।’

কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন বলেন, ‘ওই চক্রের তিন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। বাকি সদস্যদের যেকোনোভাবে আইনের আওতায় আনা হবে। মূলত এরা সরকারের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি জানান, গত মঙ্গলবার পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির লোকজন যাচাই-বাছাই করে কক্সবাজার সদরে রেলের অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণ দেবে আসল জমির মালিকদেরকে। প্রয়োজনে বাড়িতে গিয়েই জমির অধিগ্রহণের চেক বুঝিয়ে দেওয়া হবে।



মন্তব্য