kalerkantho


প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ

সব শিক্ষকের একযোগে বদলির আবেদন

দীঘিনালা বেতছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

জাকির হোসেন, দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি)   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



উপজেলার বেতছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের হয়রানির অভিযোগে কর্মরত সব শিক্ষক একযোগে বদলির আবেদন করেছেন। এদিকে এবার এ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অর্ধেক পরীক্ষার্থী ফেল করেছে। এজন্য অভিভাবকরাও ক্ষুব্ধ। তাঁরা ফলাফল বিপর্যয়ের জন্য শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের বিরোধকে দায়ী করেছেন।

বদলির জন্য আবেদনকারী সাত শিক্ষকের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম, নানা অজুহাতে সহকারী শিক্ষকদের হয়রানি এবং অতিরিক্ত খবরদারির কারণে তাঁদের চাকরিজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেছে। সামান্য ত্রুটি হলেই সহকারী শিক্ষকের বেতন বন্ধ রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিত আবেদন করেন প্রধান শিক্ষক। এসব কারণে অন্যত্র বদলি হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন তাঁরা। একই কারণে এর আগেও একের পর এক আরো চার শিক্ষক বদলি হয়ে চলে গেছেন।

গত ৪ জানুয়ারি ওই বিদ্যালয়ের সাত শিক্ষক একসঙ্গে অন্যত্র বদলির ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লিখিত আবেদন করেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবরে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি এবং স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার শাহআলম ভূঁইয়া সজীব। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিয়া মো. ওমর ফারুক মাসুদও বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আপনার (প্রতিবেদক) কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যাঁরা আবেদন করেছেন, অভিযোগ সম্পর্কে তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন।’

আবেদন পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মিনহাজ উদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখছি কিভাবে কি করা যায়।’

বদলির জন্য আবদেনকারী শিক্ষকরা হলেন জাহেদুননেছা, শাহনাজ আক্তার, মো. ছগির হোসেন, মো. মোস্তফা কামাল, মো. রফিকুল ইসলাম, ফাতেমা-তুজ-জোহরা ফাতেমা ও আনজুমান আরা। জাহেদুননেছা জানান, বর্তমান প্রধান শিক্ষকের এ বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে তাঁর স্বেচ্ছাচারিতায় সবাই অতিষ্ঠ। দীর্ঘদিন ধরে এসব সহ্য করে আসলেও এখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এ অবস্থায় একই কর্মস্থলে তাঁর সঙ্গে চাকরি করা সম্ভব নয়। তাই বদলির জন্য আবেদন করা হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের অনেক অনিয়ম-দুর্নীতি রয়েছে। তবে এখন এসব বলা ঠিক হবে না। সহকারী শিক্ষকরা এসবের প্রতিবাদ করলে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়।’

জানা যায়, বেতছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৩ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়। পর্যায়ক্রমে এখন ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত চালু আছে। বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে ২০০৮ সালের ১৮ অক্টোবর যোগদান করেন মিয়া মো. ওমর ফারুক মাসুদ।

শিক্ষকদের বিরোধের কারণ খোঁজ করতে গিয়ে কথা হয় অভিভাবকদের সঙ্গে। তাঁরা জানিয়েছেন, শিক্ষকদের বিরোধের কারণে বিদ্যালয়ে পাঠদানের মান একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। যার কারণে প্রতিটি শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো শিক্ষার্থীদেরও ফলাফলও খারাপ হচ্ছে। অভিভাবকদের অধিকাংশ বিরোধের জন্য প্রধান শিক্ষকের ব্যর্থতা তুলে ধরে তাঁকেই দায়ী করেছেন। ব্যর্থতার দায় চাপিয়েছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির ওপরেও। এছাড়া অভিভাবকের অনেকে বলছেন, প্রধান শিক্ষককেই সরিয়ে দেওয়া হোক। বদলির জন্য আবেদনকারী শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে যেন থাকেন।

অভিভাবক লিয়াকত আলি (৪৫) জানান, একই কারণে এর আগেও চারজন শিক্ষক বদলি হয়ে চলে গেছেন। আরেক অভিভাবক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, তাঁর মেয়ে রাবেয়া খাতুন এ বছর ৫ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। রাবেয়ার ক্রমিক নম্বর ১৪। কিন্তু প্রতিবছর রাবেয়ার ক্রমিক হতো ২ বা ৩। রাবেয়ার বাবার দাবি, তার ফলাফল খারাপ হওয়ার জন্য শিক্ষকদের বিরোধে বিদ্যালয়ে সঠিক পাঠদান না হওয়াই দায়ী।

অভিভাবক আমজাদ হোসেন এবং কিরণ চাকমাসহ অনেকে জানান, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কঠোর আচরণের কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার অনেক শিক্ষার্থী অন্য বিদ্যালয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট এলাকার পাড়াপ্রধান হেমব্রত কার্বারি অভিযোগ করে বলেন, ‘এ প্রধান শিক্ষকের হয়রানির কারণে বিদ্যালয় থেকে সর্বশেষ বদলি হয়ে চলে গেছেন চাকমা সম্প্রদায়ের একজন শিক্ষক। এখন স্কুলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চাকমা সম্প্রদায়ের জুনিয়র শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষক নেই।’

হেমব্রত আরো বলেন, ‘বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি গঠনের সময় সচেতন কাউকে জানানো হয় না। প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশে তাঁর অনুগত লোকদের দিয়ে কমিটি করা হয়।’



মন্তব্য