kalerkantho


দেশের প্রথম ‘নিসর্গ শহীদ’ টেকনাফের রফিক

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দেশের প্রথম ‘নিসর্গ শহীদ’ টেকনাফের রফিক

রফিকুল আলম

সবুজ বনায়ন আর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রাণ দিয়েছিলেন দেশের প্রথম ‘নিসর্গ শহীদ’ রফিকুল আলম। ‘প্রকৃতি বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে’-এ স্লোগান ছড়িয়ে দিতে গিয়ে ২৮ বছরের টগবগে যুবক রফিক বনদস্যুদের ছুরিকাঘাতে মারা যান। কক্সবাজারের টেকনাফ সাগরপাড়ের রফিক সবুজ রক্ষার প্রত্যয়ে দাঁড়িয়েছিলেন একজন সাহসী মানুষ হয়ে। দেশের প্রকৃতি রক্ষার আন্দোলনে অদম্য সাহসের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। তবে তাঁর এই সাহসিকতা অনেকের কাছে অজানা।

বন বিভাগ যখন সীমিত লোকবল দিয়ে বনাঞ্চল রক্ষা করতে পারছিল না, তখনই নিসর্গ সহায়তা প্রকল্পের মাধ্যমে এলাকার লোকজনকে সচেতন করার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। এমন মহৎ কাজের অগ্রভাগে এগিয়ে আসেন শ্রমজীবী যুবক রফিক। তিনি শুনতে পেয়েছিলেন নিসর্গ তথা প্রকৃতিরক্ষার বাণী। তিনি নেমেছিলেন, ‘এসো সবুজকে রক্ষা করি’ আন্দোলনে।

১৯৭৯ সালে ২৫ জানুয়ারি রফিকুল আলমের জন্ম কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর পুরানপাড়া গ্রামে। বাবা নুর আহমদ আর মা লায়লা বেগমের ঘরে পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে রফিক সবার বড়। দরিদ্র পরিবারের সন্তান রফিক খেয়ে না খেয়েই বড় হন। মক্তবের লেখাপড়া শেষ করে স্থানীয় শামলাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া তাঁর। পরিবারের আর্থিক অসঙ্গতির কারণে আর লেখাপড়া করতে পারেননি। প্রথমেই তিনি বাবার সঙ্গে কৃষিশ্রমিকের কাজ করেন। পরে মৎস্যশ্রমিক হয়ে অভাবের সংসারে ঘানি টানতে শুরু করেন।

বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর বাজার এলাকার সমাজসেবী সাইফুল কম্পানি জানান, শৈশবকাল থেকে মানুষের প্রতি আন্তরিকতা আর সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে চলতেন রফিক। রফিক হয়তোবা স্বপ্ন বুনতেন বড় হয়ে একদিন এলাকার দরদি সমাজকর্মী হয়ে মানুষের সেবায় থাকবেন।

কক্সবাজারের দক্ষিণ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আলী কবির জানান, টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রক্ষার উদ্দেশ্যে ২০০৫ সালে বন বিভাগের নিসর্গ কর্মসূচি চালু হয়। এ কর্মসূচির আওতায় টেকনাফের শীলখালীতে নিসর্গ সহায়তা প্রকল্পের একটি জনসচেতনতা সভায় যোগ দেওয়ার পর রফিকের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা আসে। এরপর থেকে প্রকৃতিরক্ষার চেতনায় রফিক এগোতে থাকেন।  অতপর ২০০৬ সালের ১৫ অক্টোবর নিসর্গ বন পাহারাদলে যোগ দেন রফিক।

রফিক বন পাহারা দলে যোগ দিয়ে ভালো কাজের জন্য শীলখালী আকাশমণি বন পাহারা দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ৪২ জনের নিসর্গ পাহারা দলটি শামলাপুর সেগুনবন, মনখালী বিটের বিভিন্ন এলাকায় দিনে-রাতে পাহারা দিতে থাকেন। রফিকের তত্পরতায় শামলাপুরে বৃক্ষনিধন এবং চুরি ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। আর এমন সময়ে কাঠ পাচারকারী তথা বনদস্যুদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়ে উঠেন অদম্য সাহসী প্রকৃতিপ্রেমী রফিক। এমনকি কাঠ চোরাকারবারিরা তাঁকে হত্যার হুমকিও দিয়ে আসছিল। কিন্তু কাউকে পরোয়া করেননি তিনি সবুজ বনায়ন আর প্রকৃতি রক্ষার ব্যাপারে।

২০০৮ সালের ২৩ মার্চ রাতে রফিকের কাছে খবর আসে, পার্শ্ববর্তী সরকারি সেগুনবাগান এলাকার মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে চোরের দল। সাহসী রফিক সেই রাতেই বাবা এবং স্ত্রীর বাধা না মেনে ঘর থেকে বেরিয়ে যান কাঠচোরদের প্রতিরোধের জন্য। রফিক পথিমধ্যে কাঠচোরের দলকে গাছ নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা দেন। আর এমন সময়ে একই এলাকার বনদস্যু এজাহার মিয়া ও তাঁর তিন ছেলে কামাল, কাসিম ও নাজিমসহ পাঁচজন মিলে রফিককে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করেন। মারাত্মক আহত অবস্থায় রফিক ঘটনাস্থলের অদূরেই মৃত্যুবরণ করেন।

টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের ওয়ার্ড মেম্বার আজিজুল ইসলাম আয়াছ বলেন, ‘এমন একজন দেশপ্রেমিক এবং প্রকৃতিপ্রেমী বনদস্যুদের হাতে খুন হওয়ার পরও এর বিচার এখনো পায়নি নিহত রফিকের পরিবার। ইতোমধ্যে হত্যাকারী এজাহার মিয়াও মৃত্যুবরণ করেছেন।’

দরিদ্র পরিবারের সন্তান রফিক দেশের সবুজ বনায়ন রক্ষায় ছিলেন কঠোর। প্রকৃতির প্রতি তাঁর মমতা ছিল অন্যরকম। বন বিভাগের নিসর্গ সহায়তা প্রকল্পের এই লড়াকু সৈনিক রফিকের আত্মদানকে স্মরণ করে শীলখালী সহব্যবস্থাপনা কমিটির উদ্যোগে ক্লাইমেট রিজিলিয়েন্ট ইকোসিস্টেমস অ্যান্ড লাইভলিহুডস (ক্রেল) প্রকল্পের সহযোগিতায় প্রতিবছর ২৩ মার্চ পালন করা হয় ‘সহব্যবস্থাপনা দিবস’। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আলী কবির বলেন, ‘‘কক্সবাজারের রফিকুল আলমই দেশের প্রথম নিসর্গ শহীদ। তাই ২৩ মার্চ রফিকের স্মরণে ‘সহব্যবস্থাপনা দিবস’ পালনের জন্য সরকারের নিকট প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। যা এখনো বিবেচনাধীন।’’

প্রকৃতিবিদ বিশ্বজিত সেন বাঞ্চু জানান, পরিবেশ প্রকৃতিরক্ষায় রফিকের এই আত্মদানকে সম্মান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ১ জুন জাতীয় বৃক্ষমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রফিকুলের পরিবারকে এক লাখ টাকার চেক প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘সরকারি উদ্যোগে রফিকের দুই মেয়ে মিতা নূর ও উম্মে আকতারের ভরণ পোষণের ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন।’


মন্তব্য