kalerkantho

‘সুশিক্ষার ফেরিওয়ালা’

এনায়েত হোসেন মিঠু, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘সুশিক্ষার ফেরিওয়ালা’

ডা. জামসেদ আলম

‘সুশিক্ষার ফেরিওয়ালা’ বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জামসেদ আলম। নিজগ্রাম শাহেবদীনগর থেকে করেরহাটের দুর্গম পাহাড়, বঙ্গোপসাগর উপকূল সবখানে সুশিক্ষার আলো ছড়ানোর কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন হাসপাতাল, স্কুল, গণপাঠাগার ও সামাজিক সংগঠনসহ অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি তিনি কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বাজাজ বাংলাদেশের ‘ইনভিজিবল বাংলাদেশি’ পুরস্কার অর্জন করেছেন।

একটা সময় মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী ইউনিয়নের শাহেবদীনগর গ্রামের গরিব পরিবারের শিশুরা ছিল শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। গত দুই দশকে ডা. জামসেদের হাতের ছোঁয়ায় বদলে গেছে পুরনো দৃশ্যপট। তিনি বায়ান্নের ভাষাসৈনিক মরহুম সৈয়দুল হকের সন্তান। নিজগ্রামে বাবার নামে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সৈয়দুল হক উচ্চ বিদ্যালয়, মায়ের নামে রাফিয়া খাতুন শিশুকানন স্কুল আর দাদির নামে  মাগনবিবি ফ্রি স্কুল। গত বছর তাঁর অগ্রজ বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও গবেষক অধ্যাপক ড. শামসুল আলম সাঈদের নামে প্রতিষ্ঠা করেন দুটি গণপাঠাগার।

গ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্প বলতে গিয়ে ডা. জামসেদ বলেন, ‘গ্রামের যতজন শিশু স্কুলে যায় ঠিক ততজন শিশু স্কুলে যায় না। বিষয়টি আমার নজরে আসার পর বাবার নামে প্রথমে প্রতিষ্ঠা করি সৈয়দুল হক উচ্চ বিদ্যালয়। এরপর গরিব শিশুদের জন্য মাগনবিবি ফ্রি স্কুল, পরে রাফিয়া খাতুন শিশুকানন।’

ডা. জামসেদ সুশিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার কার্যক্রম শুধু নিজ গ্রামে সীমাবদ্ধ রাখেননি। করেরহাট ইউনিয়নের পাহাড়ের সাইবেনীখিল নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন প্রাথমিক বিদ্যালয়। পাড়ার সর্দার রূপাইধন ত্রিপুরার নামে প্রতিষ্ঠিত ওই স্কুলের শিশুদের শিক্ষা ও স্থাস্থ্যসেবার যাবতীয় খরচ নির্বাহ হয় তাঁরই প্রতিষ্ঠিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘উন্নয়ন ফোরাম’ থেকে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক ও কর্মজীবনের পাশাপাশি জামসেদ আলম দেশের নানা প্রান্তে গড়ে তোলেন একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সংস্থা ও হাসপাতাল। ১৯৯৭ সালে মিরসরাইয়ের শাহেবদীনগর গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সৈয়দুল হক রাফিয়া খাতুন’ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট। এ ট্রাস্টের মাধ্যমে এলাকার গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার খরচ নির্বাহ করা হয়। ২০০২ সালে নারীদের জন্য মিরসরাই সদরে প্রতিষ্ঠা করেন ৫০ শয্যার ‘মাতৃকা হাসপাতাল’। ২০০৭ সালে ভৈরবের কিশোরগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেন ‘কিশোরগঞ্জ মাতৃকা আধুনিক হাসপাতাল’। একই বছর দেশের অবহেলিত হাওর অঞ্চলের চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘কিশোরগঞ্জ-হাসুক মাতৃকা আধুনিক হাসপাতাল’। এটি বাঙালপাড়া অষ্টগ্রামে অবস্থিত। ওই বছর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সীতাকুণ্ড জেনারেল হাসপাতাল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। অধ্যাপক জামসেদ সমাজসেবার পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। মিরসরাইয়ে যে কটি স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে সবকটিতেই রয়েছে তাঁর পদচারণা।

মিরসরাই প্রেস ক্লাব সভাপতি শারফুদ্দীন কাশ্মীর বলেন, ‘আমরা ডা. জামসেদ আলমের নেতৃত্বে ২০১৬ সাল থেকে উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, সমৃদ্ধকরণ এবং নানাবিধ সমস্যা নিরসনে কাজ করছি। নাহেরপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সৈয়দুল হক উচ্চ বিদ্যালয়, ওচমানপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও সুফিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঠাগার সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে দেওয়া হয়েছে আলমিরা ও প্রয়োজনীয় বই। ইছাখালী ইউনিয়নের চরশরৎ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে পাঠাগার। এছাড়া এসব স্কুলের সমস্যা চিহ্নিত করে সংস্কারকাজেও অর্থ দিয়ে সহায়তা করা হয়।’

মিরসরাই কলেজের অধ্যক্ষ নুরুল আবছার বলেন, ‘চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো একটি কঠিন কাজের পাশাপাশি সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য তাঁর অবদান রাখা আশ্চর্যের বিষয়।’

বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে একাত্তরের এপ্রিল মাসে যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। ১৯৭২ সালে সিলেট মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী হিসেবে জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে এমবিবিএস পাস করেন।

ডা. জামসেদ আলম ১৯৪৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর মিরসরাইয়ের ইছাখালী ইউনিয়নের শাহেবদীনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ভাষাসৈনিক মরহুম ছৈয়দুল হক। মা মরহুমা রাফিয়া খাতুন। ছয় ভাই ও দুই বোনের মাঝে তিনি চতুর্থ। ডা. জামসেদের ছেলে ডা. তন্ময় জামসেদ আলম ও মেয়ে ডা. সোনালী জামসেদ আলম। সহধর্মিণী  ডা. আফরোজা হাসপাতালের চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন।


মন্তব্য