kalerkantho


৩০টি গাড়ি উপহার পেল জেলা পুলিশ

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



৩০টি গাড়ি উপহার পেল জেলা পুলিশ

দুর্ধর্ষ জঙ্গির সম্ভাব্য আস্তানার তথ্য পাওয়া গেছে। ছুটতে হবে লোহাগাড়া থানায়।

একদল পুলিশ অভিযান শুরু করবে। কিন্তু পর্যাপ্ত গাড়ি নেই পুলিশের। এবার বেসরকারি পর্যায় থেকে গাড়ি ভাড়া করার পালা। ততক্ষণে বয়ে যায় সময়। ফলে অভিযানে যেতে দেরি হয়ে যায়। এমন সমস্যা চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের নিত্যদিনের।

গত মার্চ মাসে মিরসরাই, লোহাগাড়া, পটিয়া ও সীতাকুণ্ডে জঙ্গি আস্তানা এবং জঙ্গির সন্ধান করতে গিয়ে গাড়ির সংকট পুলিশকে মারাত্মকভাবে দুর্ভোগে ফেলে। একদিকে জামায়াতুল মুজাহেদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) জঙ্গিদের নাশকতামূলক অপতত্পরতা, অন্যদিকে একাধিক স্থানে জেএমবির সন্দেহভাজন আস্তানার তথ্য যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া-দুটোতেই পুলিশকে চরম হিমশিম খেতে হয়। বেসরকারি পর্যায়ের গাড়ি ভাড়ায় তথ্য ফাঁসের আশঙ্কাও থাকে।

এমন সব আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সার্বক্ষণিক গাড়ির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিলেন জেলা পুলিশ সুপার নুরেআলম মিনা। এ পর্যন্ত তাঁর উদ্যোগে চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য এবং বিভিন্ন শিল্পগ্রুপের কাছ থেকে মিলেছে ২০টি গাড়ি ও ১০টি মোটরসাইকেল। যার মূল্য প্রায় ছয় কোটি টাকা।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কেন বেসরকারি গাড়ি অনুদান হিসেবে গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হলো?-এমন প্রশ্নের উত্তরে চট্টগ্রামের জেলা পুলিশ সুপার নুরেআলম মিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেলার জেলার আয়তন পাঁচ হাজার ২৮৩ বর্গকিলোমিটার। থানার সংখ্যা ১৬টি। এর বাইরে তদন্তকেন্দ্র ও পুলিশ ফাঁড়ি আছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী সীমান্ত থেকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এলাকা শুরু। শেষ হয়েছে লোহাগাড়ার চুনতি এলাকায় গিয়ে। মাঝখানে দূরত্ব ১১০ কিলোমিটারের বেশি। এর বাইরে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ থানা, সন্ত্রাসপ্রবণ ফটিকছড়ি থানার মতো এলাকা রয়েছে। যে ফটিকছড়ি উপজেলার আয়তন একটি জেলার আয়তনের সমান। এতো বড় একটি জেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের যতোটা গাড়ি দরকার, সরকারিভাবে ততোটা গাড়ি নেই। এ কারণে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। ’

তিনি আরো বলেন, ‘একাধিক বড় অভিযান পরিচালনার সময় গাড়ির ভোগান্তি পুলিশকে বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই চট্টগ্রামের জনপ্রতিনিধি ও শিল্পগ্রুপের কাছ থেকে অনুদান হিসেবে গাড়ি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই পর্যন্ত ২০টি গাড়ি পাওয়া গেছে। এসব জেলা পুলিশ ও থানা পর্যায়ে বরাদ্দ করা হয়েছে। এর আগেও পুলিশ সাতটি গাড়ি পেয়েছিল বেসরকারি খাত থেকে। ’

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) মোহাম্মদ রেজাউল মাসুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের থানাগুলোর আয়তন বড়। এ কারণে প্রতিটি থানায় পেট্রল ডিউটির জন্যই গড়ে চারটি গাড়ি প্রয়োজন। সেই হিসাবে ১৬ থানার জন্য গাড়ি প্রয়োজন ৬৪টি। কিন্তু ১৬ থানায় সরকারিভাবে গাড়ি আছে মাত্র ৩৩টি। এর বাইরে কিছু গাড়ি আছে পুলিশ লাইনে। এগুলো জেলা পর্যায়ে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু থানা পর্যায়ে নিয়মিত পেট্রল ডিউটিসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে গাড়ি কম থাকায় থানা পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছিল। এমতাবস্থায় জনপ্রতিনিধি ও শিল্পগ্রুপের কাছ থেকে গাড়ি সংগ্রহের উদ্যোগ নেন পুলিশ সুপার। ’

পুলিশ সুপারের আহ্বানে এগিয়ে এসেছেন সন্দ্বীপের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান, চন্দনাইশের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মো. নজরুল ইসলাম চৌধুরী, পটিয়ার সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরী। শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেএসআরএম, জিপিএইচ, বিএসআরএম, এস আলম, বায়েজিদ স্টিল, কনফিডেন্স সিমেন্ট, সাদ মুসা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কস, আয়ুব অ্যান্ড হোসাইন সোসাইটি, ফুলকলি, চৌধুরী ও বেগম ফেরদৌস আরা ফাউন্ডেশন ও শিল্পপতি মো. সাদাত আনায়ার সাদী। এছাড়া আরো কয়েকজন ব্যক্তি পুলিশের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

এসব ব্যক্তি ও শিল্পগ্রুপ জেলা পুলিশকে জিপ, বাস, ডাবল কেবিন পিকআপ, সিঙ্গেল কেবিন পিকআপ, মাহিন্দ্রা সিঙ্গেল কেবিন পিকআপ, রেকার, হাইলাক্স ডাবল কেবিন পিকআপ ও মোটরসাইকেল অনুদান দিয়েছেন। গাড়ির মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৬ লাখ টাকার গাড়িও রয়েছে। মোট হিসাবে জেলা পুলিশ প্রায় ছয় কোটি টাকার গাড়ি উপহার পেল।

বেসরকারি খাত থেকে গাড়ি সংগ্রহ উদ্যোগ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার নুরেআলম মিনা জানান, থানাগুলোতে সরকারি গাড়ি আছে একটি। এই গাড়ি প্রটেকশন ডিউটিতেই বেশি ব্যস্ত থাকে। অভিযান ও টহলের জন্য গাড়ি রিকুইজেশন করতে হয়। আবার এই ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের কিছু বিধিনিষেধ আছে। সাধারণ মানুষও এই প্রক্রিয়ায় হয়রানির শিকার হয়। এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তি ও শিল্পোদ্যোক্তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও একই আহ্বান জানিয়েছেন। তাই বেসরকারি খাত থেকে গাড়ি অনুদান হিসেবে নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

পুলিশ সুপার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘গত সপ্তাহে সর্বশেষ ডাবল কেবিন পিকআপ ও মোটরসাইকেল অনুদান দিয়েছে কেএসআরএম গ্রুপ। তাদের দেওয়া এই গাড়ি ও মোটরসাইকেল পাঠানো হয়েছে সাতকানিয়ায়। কারণ, ওই গ্রুপের মালিকের বাড়ি সাতকানিয়ায়। তিনি পুলিশকে গাড়ি অনুদান দিয়ে প্রকারান্তরে সাতকানিয়ার মানুষের নিরাপত্তার কাজেই সহযোগিতা করেছেন। এভাবে যদি আরো ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে তাহলে পুলিশের গাড়ি সংকট থাকবে না। তাতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিঃসন্দেহে উন্নতি হবে। ’


মন্তব্য