kalerkantho


মেহেরপুর

অনিয়ম-নির্যাতন উঠে এলো যাত্রাপালায়

ইয়াদুল মোমিন, মেহেরপুর   

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অনিয়ম-নির্যাতন উঠে এলো যাত্রাপালায়

মেহেরপুরে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে গত শুক্রবার মঞ্চস্থ হয় যাত্রা ‘পদধ্বনি’। ছবি : কালের কণ্ঠ

সমাজপতিদের লুণ্ঠন, পুলিশের অনিয়ম-নির্যাতন, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের কুফল এবং সাংবাদিক লাঞ্ছনার মতো সমাজের বাস্তব সমস্যা উঠে এসেছে একটি যাত্রাপালায়। ‘পদধ্বনি’ যাত্রাটি গত শুক্রবার মঞ্চস্থ হয় মেহেরপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে।

‘শেকড়ের অনুসন্ধানে, এসো মিলি বিশুদ্ধ যাত্রা আয়োজনে’ স্লোগানে স্থানীয় যাত্রাশিল্পীদের অভিনয়ে চলছে ৯ দিনব্যাপী যাত্রা উৎসব। গত শুক্রবার উদ্বোধনী দিনে দেখা গেল বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ যাত্রাপালা উপভোগ করতে এসেছে। সঙ্গে নিয়ে এসেছে কোলের শিশুকে। গত শনিবার স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ অরুণের মায়ের মৃত্যুতে যাত্রা মঞ্চস্থ হয়নি। এক দিন বিরতি দিয়ে গতকাল রবিবার থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে এ উৎসব।

প্রথম দিনের পরিবেশনায় মুগ্ধ দর্শকরা। এদিনের যাত্রার কাহিনি ভারতের সাঁওতাল অধ্যুষিত হিজলডিহি এলাকার। মহাজনের সহযোগী ধর্মেশ্বরের চাকর হিসেবে কাজ করে সাঁওতাল তম্রু কিসকু। ধর্মেশ্বরের লুট করা চাল নিয়ে যাওয়ার পথে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তম্রু। ধর্মেশ্বর জানতে পেরে দারোগাবাবুর বাড়িতে দুই বস্তা চাল পৌঁছে দেওয়ার শর্তে ঘটনা ধামাচাপা দেয়। এদিকে তম্রুর স্ত্রী ফুল কুড়িয়ে বাড়ি যাচ্ছিল। পথে দারোগাবাবুর কুদৃষ্টি পড়ে তার ওপর। জোর করে অনৈতিক কাজ করতে গেলে সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা পড়ে। পরে সাংবাদিকের ওপর হামলা চালিয়ে দারোগাবাবু তার ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়। অন্যদিকে বড় ভাই মনিলাল নায়ককে লেখাপড়া শেখানোর জন্য মহাজন সূর্য শংকরের কাছে সব জমিজিরাত বন্ধক দিয়ে পথের ভিখারি হয়ে যায়। সাঁওতাল ও নিরীহ শ্রেণির মানুষের ওপর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আলম মাস্টার সবাইকে একত্র করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে আলম মাস্টারের নেতৃত্বে সাঁওতাল ও দরিদ্ররা একত্র হয়ে মহাজনদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং তারা বিজয়ী হয়। এভাবে এগিয়ে চলে কাহিনি। এদিন অভিনয় করে দর্শকের মন জয় করেন মহাজন সূর্য শংকরের চরিত্রে মশিউজ্জামান বাবু এবং নায়কের বড় ভাই মনিলালের চরিত্রে ওয়াদুদ হোসেন। এ ছাড়া দারোগার ভূমিকায় তৌহির হাসান, আলম মাস্টারের চরিত্রে সাইদুর রহমান, সূর্য শংকরের সহযোগী ধর্মেশ্বর চরিত্রে আনোয়ারুল হাসান, সাংবাদিকের চরিত্রে আলী রেজা বিজু, হীরা, সাঁওতাল তম্রু কিসকুর চরিত্রে বাবু, নায়কের চরিত্রে মহিতুল ইসলাম এবং নায়িকার চরিত্রে হীরা অভিনয় করেন। ‘পদধ্বনি’ শ্রী ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায় রচিত ও মশিউজ্জামান বাবু পরিচালিত। এর অভিনেতারা জেলা শিল্পকলা একাডেমির যাত্রাশিল্পী।

ওই দিন সদর উপজেলার খোকসা গ্রাম থেকে যাত্রা দেখতে আসা যুবক রনি বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে যাত্রা পালা হলে সেখানে অশ্লীলতায় ভরপুর থাকে। পরিবারের কাউকে নিয়ে দেখা যায় না। এমনকি নিজেরাও যেতে পারি না। তবে শহরের এই যাত্রা দেখে মুগ্ধ হলাম।’

সংস্কৃতিকর্মী মাহবুবুল হক জানান, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে সুস্থ ধারার যাত্রা প্রাণ ফিরে পাবে। শিল্পীরা যাত্রায় অভিনয়ের জন্য উৎসাহিত হবেন। প্রতিবছর এ ধরনের উৎসবের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

উল্লেখ্য, মেহেরপুর পৌরসভার সহযোগিতায় ৯ দিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন করে জেলা শিল্পকলা একাডেমি। গত শুক্রবার পৌরসভার মেয়র মাহফুজুর রহমান উৎসবের উদ্বোধন করেন। জেলা শিল্পকলা একাডেমির সহসভাপতি নুরুল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম রসুল, পুলিশ সুপার আনিছুর রহমান, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক খাইরুল হাসান, মেহেরপুর সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক হাসানুজ্জামান মালেক, জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আব্দুল আজিজ ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অরণী থিয়েটারের সভাপতি নিশান সাবের। বাকি দিনগুলোতে ‘সন্তানহারা মা’, ‘বধূ এলো ঘরে’, ‘অচিন গাঁয়ের বধূ’, ‘এক মুঠো অন্ন চাই’, ‘জীবন নদীর তীরে’, ‘শ্মশানে হলো ফুলশয্যা’, ‘অভাগিনী বধূ’ ও ‘নীলকুঠির কান্না’ মঞ্চস্থ হবে। জেলার বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর শিল্পীরা এতে অভিনয় করবেন।



মন্তব্য