kalerkantho

শুঁটকিরাজ্য

বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্ত্তী, বাগেরহাট   

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শুঁটকিরাজ্য

মিঠা পানির মাছ শুকানোর কাজে ব্যস্ত দুই নারী। ছবিটি বাগেরহাটের চিতলমারীর কলিগাতী গ্রাম থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সমুদ্রের নোনা পানির মাছের শুঁটকির পরিচিতি দেশ-বিদেশে। কিন্তু মিঠা পানির মাছের শুঁটকির সঙ্গে অনেকেই পরিচিত নয়। বাগেরহাটের চিতলমারীর পল্লীতে মিঠা পানির মাছের শুঁটকি তৈরি চলছে। উপজেলার চরকুড়ালতলা, কলিগাতীসহ কয়েকটি গ্রামে মিঠা পানির মাছ কাটা, বাছা এবং শুকানোর ধুম পড়েছে।

অন্যদিকে সাগরের মোহনায় দুবলার চরজুড়ে নোনা পানির মাছ শুঁকানোর কাজ চলছে। পরিকল্পনা নিয়ে মিঠা পানির মাছের শুঁটকি করা গেলে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর টাকা আয় করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

মৎস্য বিভাগ বলছে, বাগেরহাটে প্রতিবছর ৩১ হাজার ৩৪৬ মেট্রিক টন সাদা মাছের (মিঠা পানি) চাহিদা রয়েছে। উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৫২ হাজার মেট্রিক টন। চাহিদার চেয়ে প্রায় ২১ হাজার মেট্রিক টন মাছ বেশি উৎপাদিত হচ্ছে। এ মাছের গুণগত মান ঠিক রেখে শুঁটকি করা গেলে প্রচুর টাকা আয় সম্ভব।

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের কলিগাতী গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ঘেরের মধ্যে বাঁশের খুঁটি দিয়ে উঁচু করে মাচা তৈরি করা হয়েছে। মিঠা পানির বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় মাছ এনে রাখা হচ্ছে ওই মাচার ওপর। কয়েকজন নারী-পুরুষ মাছ কাটা, বাছা আর শুকানোর কাজ করছে। শীতের কুয়াশা ভাঙা রোদের পুরোটাই মাছের গায়ে লাগাতে চায় তারা। মাচার নিচে পানি আর কাদামাটি। পাশে রয়েছে মৎস্যঘের এবং বোরো ধানের বীজতলা। দেখা গেছে, বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারাও এসেছে মিঠা পানির শুঁটকি কিনতে। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে হিজলা ইউনিয়নের চরকুড়ালতলা গ্রামে গিয়েও দেখা গেছে একই ছবি।

জানা গেছে, চিতলমারীর বেশির ভাগ এলাকায় রয়েছে চিংড়িঘের এবং মাছের ঘের। ওই সব ঘেরের মধ্যে ধান চাষ আর পারে বছরজুড়ে বিভিন্ন সবজি চাষ হয়। শীতে অনেক ঘেরের পানি শুকিয়ে যায়। ফলে মালিকরা ওই সব ঘেরে উৎপাদিত পুঁটি, বাইন, খলিশা, টাকি, শৈল, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে এনে শুকিয়ে শুঁটকি করেন। স্থানীয় হাট-বাজারে চাহিদা না থাকলেও চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলায় মিঠা পানির মাছের শুঁটকির চাহিদা রয়েছে।

কলিগাতী গ্রামের ছালমা বেগম জানান, তাঁদের ছয় বিঘার মাছের ঘের রয়েছে। ঘেরে উৎপাদিত বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছের চাহিদা স্থানীয় বাজারে কম থাকায় তাঁরা শুঁটকি করে বিক্রি করছেন। গত বছর থেকে তাঁরা শুঁটকি করছেন। শুঁটকি মাছ লাভজনক বলে মনে করেন তিনি।

ওই গ্রামের নমিতা রানী মণ্ডল জানান, শীতে ঘের শুকিয়ে যায়। এ কারণে ঘেরে মাছ রাখা যায় না। ছোট আকারের ওই সব মাছ নষ্ট না করে ঘের থেকে ধরে এনে রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করা হচ্ছে।

চরকুড়ালতলা গ্রামের শুঁটকি ব্যবসায়ী বাদশা শেখ জানান, বিভিন্ন আড়ত থেকে প্রতিদিন অল্প দামে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় মাছ কিনে এনে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুকানো হয়। পুরো শীতেই ওই মাঠে মাছ শুকানোর কাজ চলে। ওই শুঁটকিপল্লীতে অনেক নারী-পুরুষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। প্রায় এক সপ্তাহের রোদে মাছ শুকানোর পর তা শুঁটকি হয়। তিন বছর ধরে তিনি শুঁটকি মাছের ব্যবসা করছেন। এ ছাড়া উপজেলার বারাশিয়া, কলিগাতী, হিজলা ও ডুমুরিয়া গ্রামে কয়েক বছর ধরে মিঠা পানির মাছ শুকানো হয় বলে বাদশা শেখ জানান।

চিতলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. সজল কান্তি বিশ্বাস বলেন, মিঠা পানির ছোট মাছ অত্যন্ত পুষ্টিকর। ওই সব মাছের শুঁটকিতে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’ রয়েছে। এগুলো মানবদেহের হাড় ক্ষয়রোধসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জিয়া হায়দার চৌধুরী জানান, সমুদ্রের নোনা পানির মাছের শুঁটকির পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু দেশে মিঠা পানির মাছের শুঁটকি তেমন একটা করা হয় না। চিতলমারীর পল্লীতে এখন মিঠা পানির বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শুঁটকি করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মাছ শুকানো গেলে শুঁটকি বিক্রি করে অনেক টাকা আয় করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

মৎস্য কর্মকর্তা জিয়া হায়দার চৌধুরী আরো জানান, চিতলমারী এলাকায় প্রচুর পরিমাণ গলদা ও বাগদা চিংড়ি এবং সাদা মাছের ঘের রয়েছে। শীতে অনেক ঘেরের পানি শুকিয়ে যায়। এ কারণে ঘের মালিকরা পানি সেচ করে ঘেরের ছোট-বড় সব মাছ ধরেন। পরে ওই ছোট মাছ নষ্ট না করে শুকিয়ে শুঁটকি করেন।

চিতলমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানান, চিতলমারীর ওই সব গ্রামে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মাছ শুঁটকি করা হচ্ছে। চিতলমারীতে ১৬ হাজার ৭১০টি ঘের, ছয় হাজার ৯৪৫টি পুকুর, তিনটি নদী এবং ৫০টি খাল রয়েছে। এখানে সাদা মাছের চাহিদা রয়েছে প্রায় তিন হাজার মেট্রিক টন। গত বছর চিতলমারীতে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার মেট্রিক টন সাদা মাছ উৎপাদিত হয়েছে।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে আসা শুঁটকির পাইকারি ক্রেতা রফিকুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন হাট-বাজারে মিঠা পানির শুঁটকির চাহিদা রয়েছে। এ কারণে তিনি চিতলমারীর পল্লী থেকে শুঁটকি কিনে বিভিন্ন হাটে পাইকারি বিক্রি করেন। শুঁটকি লাভজনক ব্যবসা বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় দুবলার চরে গত ২৩ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে শুঁটকি মৌসুম। ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ মৌসুম চলবে। শুঁটকি মৌসুম ঘিরে দুবলার চরে হাজার হাজার জেলে ব্যস্ত সময় পার করছে।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মাহমুদুল হাসান জানান, দুবলার চরে শুঁটকি মৌসুমে জেলেদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ বছর শুঁটকি মৌসুমে দুবলার চরের জন্য ৮৭০টি জেলে ঘর ও ৩৮টি ডিপো ঘরের পাস দেওয়া হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুবলার চরে শুঁটকি মৌসুম চলবে।



মন্তব্য