kalerkantho


খুলনার ঐতিহ্যবাহী পাবলিক হল

দুই যুগেই পরিত্যক্ত কোটি টাকার স্থাপনা

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দুই যুগেই পরিত্যক্ত কোটি টাকার স্থাপনা

খুলনার ঐতিহ্যবাহী পাবলিক হলটি দুই যুগ না পেরোতেই পরিত্যক্ত হয়ে আছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

খুলনা শহরে গত শতকের আধুনিক নির্মাণশৈলীর অন্যতম স্থাপনা ‘পাবলিক হল’। এখানে নগরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হতো; কিন্তু নির্মাণ ত্রুটি ও নিম্নমানের দ্রব্যসামগ্রী ব্যবহার করায় দুই যুগের ব্যবধানেই এটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এটি ভঙ্গুর ও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। চার বছর আগে এই স্থানে সিটি সেন্টার করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কর্তৃপক্ষের উদসীনতার কারণে এ কার্যক্রম থমকে আছে।

নগরীর শিববাড়ী মোড়ের পশ্চিম প্রান্তে ১ দশমিক ৭২১ একর জমির ওপর খুলনা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন ১৯৭৯ সালে পাবলিক হল কমপ্লেক্স নাম দিয়ে এর পাইলিং কাজ শুরু করে। পাইলিং শেষ হতে না হতে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে এর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। সামরিক সরকার এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর খুলনা সিটি করপোরেশনে প্রথম মনোনীত মেয়র হিসেবে ১৯৮৮ সালে দায়িত্ব পান সাবেক জাপা নেতা কাজী আমিনুল হক। তাঁর তত্ত্বাবধানে এক কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে ১৯৮৯ সালে আবারও এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। একতলা ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের আগেই ১৯৯০ সালে আবার কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে শেখ তৈয়েবুর রহমান মেয়র নির্বাচিত হন। ওই সময় তিন কোটি ১৮ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৯২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ‘জিয়া হল’ নামকরণ করে পাবলিক হলটি উদ্বোধন করেন। প্রায় ৩০ হাজার বর্গফুট আয়তনের এই হলে এক হাজার ১০০ আসনের মিলনায়তন, ১৮০ আসনবিশিষ্ট সেমিনারকক্ষ, দুটি দুই হাজার ৫০০ বর্গফুট আকারের লাউঞ্জ, মঞ্চসংলগ্ন আসবাপত্র কক্ষ, তিনটি মহরত কক্ষ, একটি বিশ্রাম কক্ষ, দুটি লেডিস কর্নার, একটি নামাজ ঘর, মেকআপ কক্ষ, অফিস, ভাণ্ডার কক্ষসহ নানা সুবিধা ছিল।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সব অনুষ্ঠানে এটিকে পাবলিক হল বলা হলেও মেয়র শেখ তৈয়েবুর রহমান কাগজে-কলমে এর নাম জিয়া হল হিসেবেই উল্লেখ করতেন। এর পরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসে। তখন এর নাম জিয়া হল থাকায় কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইকবাল জিয়া হলে এক অনুষ্ঠানে হলের সংস্কারকাজের জন্য দুই কোটি টাকা বরাদ্দ এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য প্রকল্প তৈরির নির্দেশনা দেন; কিন্তু এ কাজ সম্পন্ন হয়নি।

২০০৮ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা তালুকদার আব্দুল খালেক মেয়র নির্বাচিত হন। যথাযথ তত্ত্বাবধানের অভাবে ইতিমধ্যে হলটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ২০১১ সাল থেকে মূল মিলনায়তন এবং ২০১২ সাল থেকে পুরো হলটি ব্যবহার বন্ধ রয়েছে। উদ্বোধনের মাত্র ২৪-২৫ বছরের মধ্যেই একটি নন্দিত স্থাপনা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ওই সময়ে হলটি এত দ্রুত ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। এর প্রধান ছিলেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগীয় প্রধান ড. মুহাম্মদ হারুনুর রশিদ। ওই প্রতিবেদনে হল নির্মাণে নিম্নমানের দ্রব্যসামগ্রী ব্যবহার, নকশা অনুযায়ী তৈরি না করা এবং তদারকির ঘাটতির কথা বলা হয়।

উল্লেখ্য, হল নির্মাণে তদারকির গাফিলতির কারণে সেই সময়ের সহকারী প্রকৌশলী নাজমুল আহসান সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন। তিনিই এখন খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী। ব্যবহার অযোগ্য হলটি তখন সংস্কারের উদ্যোগ না নিয়ে সেখানে মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক ‘সিটি সেন্টার’ প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেন। এর জন্যে প্রাথমিকভাবে ২৪ কোটি টাকা বরাদ্দের অনুমোদন মেলে; কিন্তু কাজ শুরু হতে না হতেই আবারও সিটি নির্বাচন চলে আসে। ২০১৩ সালের খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পুনরায় বিএনপি নেতা মনিরুজ্জামান মনি নির্বাচিত হন। তিনি গত চার বছরেও হলটি সংস্কার বা সিটি সেন্টার নির্মাণকাজ শুরু করতে পারেননি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটি মেয়র মনিরুজ্জামান মনি কালের কণ্ঠকে জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরেই করাগারে চলে যান। ফলে পাবলিক হল প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ে। পরে হল অপসারণ করে সেখানে সিটি সেন্টার গড়ে তোলার জন্যে ৬০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়সাপেক্ষে একটি প্রকল্পের কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, তবে তা অনুমোদিত হয়নি।



মন্তব্য