kalerkantho


জনবল সংকট

সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষার কাজ চ্যালেঞ্জের মুখে

বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্ত্তী, বাগেরহাট   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষার কাজ চ্যালেঞ্জের মুখে

জনবল সংকটের কারণে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের ভেতরের পাঁচটি টহল ফাঁড়ি বন্ধ করে দিয়েছে বন বিভাগ। সুন্দরবনে বর্তমানে যে জনবল আছে, সে হিসাবে প্রতি ৯ বর্গকিলোমিটার বন রক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন প্রহরী। এর মধ্যে আবার কিছু বনরক্ষী রোগ আর বয়সজনিত কারণে অনেকটা কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। কেউ কেউ কাছাকাছি সময়ে চাকরি থেকে অবসরে যাবেন। বর্তমানে সুন্দরবনে এক হাজার ১৭৩টি পদের মধ্যে ৩৪৪টি পদ শূন্য রয়েছে। স্বল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে বিশাল এ বনজ সম্পদ পাচার ঠেকানো তথা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। বনের সম্পদ রক্ষায় জনবল বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের অববাহিকায় গড়ে ওঠা সুন্দরবনের মোট আয়তন ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে স্থলভাগের পরিমাণ চার হাজার ১৪৩ বর্গকিলোমিটার এবং জলভাগের পরিমাণ এক হাজার ৮৭৩ বর্গকিলোমিটার। ১৮৭৮ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়। সুন্দরবন জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ বিশ্বে সমৃদ্ধিশালী একটি ইকোসিস্টেম। অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল সুন্দরবন বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল সুন্দরবন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেরও লীলাভূমি। সরকার সম্প্রতি সুন্দরবনের মোট আয়তনের অর্ধেকের বেশি এলাকা অভয়ারণ্যভুক্ত ঘোষণা করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে সুন্দরবনকে পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগে ভাগ করা হয়। পূর্ব বিভাগের দাপ্তরিক কার্যক্রম বাগেরহাটে আর পশ্চিমের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় খুলনায়। শরণখোলা, চাঁদপাই, খুলনা ও সাতক্ষীরা নামে সুন্দরবনে চারটি রেঞ্জ রয়েছে। সুন্দরবনে ১৭টি স্টেশন এবং ৬১টি টহল ফাঁড়ি রয়েছে। এখানে বনজ সম্পদ পাচারকারী যেমন আছে, তেমনি শিকারিচক্রও সক্রিয় রয়েছে। জলে কুমির, ডাঙ্গায় হিংস্র বাঘ আর দস্যুদের মুখোমুখি হয়েই প্রতিনিয়ত সুন্দরবনে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সংকটের কারণে টহল ফাঁড়িগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল দিতে পারছে না বন বিভাগ।

সূত্র জানায়, সুন্দরবনের গহীনে দিন-রাত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকে নানা রোগে আক্রান্ত হন। বয়সের ভারে কেউ কেউ কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। জনবল সংকটের এ সুযোগে অনেক কর্মীকে নিয়েই চলছে বন রক্ষার কাজ। আর এ সুযোগ ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ পাচারকারী ও আন্তর্জাতিক চোরা শিকারি চক্র সুন্দরবনের বাঘ, হরিণসহ বন্যপ্রাণী এবং বনজদ্রব্য পাচার করে চলেছে। বনসম্পদ রক্ষায় জনবল নিয়োগের পাশাপাশি যাঁরা দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করা প্রয়োজন। সুন্দরবন প্রহরী কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বগী স্টেশনে কর্মরত বনপ্রহরী আব্দুস সাত্তার হাওলাদার জানান, জনবল সংকটের প্রভাব পড়ে তাঁদের ওপর। এভাবে দায়িত্ব পালন করতে তাদের হিমশিম খেতে হয়। সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষা করতে আরো জনবলের প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

বন বিভাগের খুলনা সার্কেলের বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী জানান, সুন্দরবনে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব রয়েছে। বর্তমানে যে জনবল আছে, তা দিয়ে বনজ সম্পদ রক্ষা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সুন্দরবনে মোট এক হাজার ১৭৩টি পদের মধ্যে ৮২৯ জন কর্মরত আছেন। শূন্য পদ রয়েছে ৩৪৪টি। সে হিসাবে প্রতি ৯ বর্গকিলোমিটার সুন্দরবন রক্ষার জন্য একজন প্রহরী রয়েছেন। জনবল সংকটের কারণে এরই মধ্যে সুন্দরবনের ঝাপসি, টিআরচর, হংসরাজ, ঢালীয়া ও ঝনঝনিয়া টহল ফাঁড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমীর হোসাইন চৌধুরী আরো জানান, সুন্দরবনে জনবল বাড়াতে কয়েক দফায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এক বছর ধরে সুন্দরবনে বিভিন্ন পদে নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। উচ্চ আদালতে মামলা থাকায় জনবল নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।

বন বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, বনে ফরেস্টারের ১০৫টি পদের মধ্যে ২৭টি, বনপ্রহরী ১৯১টি পদের মধ্যে ১৪টি ও নৌকাচালক ৫৪৬টির মধ্যে ১৪২টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। আগামী এক বছরে কয়েকজন অবসরে গেলে বিভিন্ন পদে আরো শূন্যতা দেখা দেবে। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মাহামুদুল হাসান জানান, সুন্দরবনে জনবল সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। জনবল সংকটের কারণে দুই-তিনজন স্টাফ দিয়ে চলছে টহল ফাঁড়িগুলো। এত অল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে বিশাল এ সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষা করা কঠিন কাজ।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেন জানান, সুন্দরবন দেশের দক্ষিণাঞ্চলে মানুষকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষাপ্রাচীর হিসেবে কাজ করছে। রয়াল বেঙ্গল টাইগারের বাস সুন্দরবনে। এখানে অসংখ্য উদ্ভিদ, জলজ ও বনজ সম্পদ রয়েছে। যেকোনো মূল্যে সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষা করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে বনপ্রহরীরাই ওই দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এ জন্য সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষায় পর্যাপ্ত জনবল থাকা দরকার। এ সংকট দ্রুত নিরসন হওয়া উচিত।



মন্তব্য