kalerkantho


বইছে ফাগুন হাওয়া

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



বইছে ফাগুন হাওয়া

‘ফাগুন হাওয়ায়’-এর দৃশ্য

এক ফাগুনে ভাষার জন্য উত্তাল রাজপথে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম-বরকত-রফিক-জব্বার। বায়ান্নর সেই দমকা হাওয়া এই ফাগুনে নিয়ে এলেন তৌকীর আহমেদনুসরাত ইমরোজ তিশা সিয়াম আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে চলচ্চিত্র ‘ফাগুন হাওয়ায়’-এর কথা বললেন পরিচালক। লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

 

টিটো রহমানের ‘বউ কথা কও’ পড়েছিলেন ২০০৫ সালে। তৌকীরের মনে হলো, এই ছোটগল্পটি রূপকভাবে ভাষা আন্দোলন ও তার চেতনাকে ধারণ করে। লেখককে তৌকীর জানালেন, এই গল্পের উপাদান নিয়ে তিনি ছবি নির্মাণ করতে আগ্রহী। নির্মাতাকে স্বাধীনতা দেন লেখক। পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন তৌকীর। ২০০৮ সালেই নির্মাণে নেমে পড়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু পৃষ্ঠপোষক পাচ্ছিলেন না। ২০১৫ সালে সরকারি অনুদান চাইলেন, পেলেন না। হতাশই হলেন। এর মধ্যে তাঁর অন্য দুটি সিনেমা মুক্তি পেল—‘অজ্ঞাতনামা’ ও ‘হালদা’। অবশেষে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এগিয়ে এলো। আটঘাট বেঁধে তৌকীর নেমে পড়লেন ‘ফাগুন হাওয়ায়’ নির্মাণে।

বায়ান্নর একটি মফস্বলের গল্প। এখানে প্রেম আছে, আছে নাটকীয়তা ও বেদনার গল্প। গল্পের নায়ক নাসির। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন সিয়াম আহমেদ। তাঁকে পছন্দ করার কারণ জানালেন পরিচালক, ‘ওকে প্রথম দেখি থাইল্যান্ডে। একটা নাটকে আমাদের কো-আর্টিস্ট। দেখলাম ছেলেটি ভদ্র, কাজে সিনসিয়ার। কথা বলে বুঝলাম সে শিক্ষিত। এ রকম ছেলেই দরকার, যে সব কিছু দ্রুত বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বুঝে নেবে। আমার একটি নাটকে নিলাম ওকে। ছবিটি করার সময় মনে হলো, ওকে ট্রাই করতে পারি। আমার মনে হয়, এই ট্রাইয়ের রেজাল্ট ভালো হয়েছে।’

প্রস্তাব পেয়ে দ্বিতীয়বার ভাবেননি সিয়াম, ‘আমি ছেড়ে দিলে অন্য যে কেউ এটা লুফে নিত। আর সিনেমাটি শেষ করার পর বুঝলাম, এটা না করলে সারা জীবন আমার আফসোস করতে হতো। ভাষা আন্দোলনের সিনেমা করেছি, এই প্রজন্মের অভিনেতা হিসেবে এটা আমার জন্য গর্বের। ভাষা আন্দোলন নিয়ে আগে সে মাপের রিমার্কেবল কোনো কাজ হয়নি। এই ছবির পেছনে আমাদের দায়িত্ববোধ অনেক বেশি, কারণ এই ছবির একটা আর্কাইভাল ভ্যালু আছে।’

পর্দায় নাসির হতে গিয়ে বেশ স্ট্রাগল করতে হয়েছে সিয়ামকে। বেশি চিন্তিত ছিলেন নিজের লুক নিয়ে। বললেন সেই গল্পও, ‘বায়ান্নর সময়ের লুক নিজের মধ্যে আনাটা খুব কঠিন। শুটিংয়ের আগে প্রায় এক মাস ধরে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছিলাম। সব শেষে যে লুকটা দাঁড় করালাম, সেটা আমার বাবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়কার লুক। ছবিতে আমার নাম নাসির, কাকতালীয়ভাবে আমার বাবার নামও নাসির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন কার্ডে বাবার যে ছবিটা ছিল, সেটা ধরেই আমার ক্যারেক্টারাইজেশন করেছি। এর আগে একেকটা লুক তৈরি করে ছবি তুলে পাঠাতাম আর তৌকীর ভাই রিজেক্ট করে দিতেন। শেষে যখন বাবার মতো সাজলাম, সেই ছবি পাঠানোর পর ভাইয়া বললেন, এভাবে এগোতে পারি।’

ছবিতে নাসিরের নায়িকা দীপ্তি। এই চরিত্রে আছেন নুসরাত ইমরোজ তিশা। চরিত্রটির কিছু বৈশিষ্ট্য জানালেন তিশা, ‘খুবই সাধারণ মেয়ে। কষ্ট পেলে কাঁদে, তার সঙ্গে সুন্দর কথা বললে সে হাসে। দাদা ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে তার সুন্দর কিছু মুহূর্ত আছে।’

বায়ান্নর সময়কার মফস্বলের মেয়ের চরিত্র করতে সমস্যা হয়নি? ‘পিরিয়ডিক্যাল ফিল্ম যেহেতু, নিজেকে কিছুটা তো তৈরি করতে হয়েছেই। এত দিন ধরে অভিনয় করি, তবু চাইলেই কিন্তু এ রকম একটা ক্যারেক্টার করতে পারব না। তবে সেই চাপটা আমি পাইনি, কারণ তৌকীর ভাই। যখনই কোনো সিকোয়েন্স নিয়ে বসেছি, ২০ মিনিটের মধ্যে তিনি কী যেন জাদু করে সব করে ফেলেন!’—বললেন তিশা।

গেটআপ নিয়ে তিশা যখন সেটে উপস্থিত হতেন, দেখতেন সবাই সে সময়ের গেটআপে। এ কারণে চরিত্রে ঢুকতে সমস্যা হতো না তাঁর।

সিয়াম যোগ করলেন, “ভাষা আন্দোলন বললেই সবার সামনে একটা চিত্র ফুটে ওঠে, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে ছাত্রদের মিছিল। আমাদের মাথায় কিন্তু মফস্বল শহরের কোনো গল্প আসে না। একটা মফস্বল শহরে এক পাকিস্তানি ইন্সপেক্টর কিভাবে সবার ওপর উর্দু চাপিয়ে দিয়েছিল, সেটা আমরা অনেকেই দেখতে পাইনি। মেটাফোর ও হিউমারের মাধ্যমে যে সত্যটা তৌকীর ভাই বলেছেন, একজন দক্ষ অভিনেতা ও চিত্রনাট্যকার না হলে সেটা এভাবে বলা সম্ভব নয়।”

এই ছবির শুটিং করাটা ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের। তৌকীর বলেন, ‘ঢাকা শহরে পিরিয়ড ফিল্ম করা খুবই কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। মফস্বলে [পাইকগাছা] করেছি বলে কিছুটা ছাড় পেয়েছি। গল্পও সেভাবেই বেছেছি। রূপকভাবে মূল আন্দোলনকেই রিপিট করবে। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে পিরিয়ড একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ছবিতে পুলিশের গাড়ি দেখাতে হবে, সেটি অবশ্যই বায়ান্ন সালের হতে হবে। মোটরসাইকেল, টাইপরাইটার, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর—সব কিছুতেই অথেন্টিসিটি থাকতে হয়। দেয়ালটা পর্যন্ত সে সময়ের মতো করে তৈরি করেছি।’

পাকিস্তানি ইন্সপেক্টরের ভূমিকায় বলিউড অভিনেতা যশপাল শর্মা। আরো আছেন আবুল হায়াত, ফজলুর রহমান বাবু, শহীদুল আলম সাচ্চু, রওনক হাসান, আফরোজা বানু, ফারুক আহমেদ, সাজু খাদেমের মতো অভিনয়শিল্পী। শুটিং শেষে আড্ডায় বসতেন সবাই মিলে। সিয়াম বলেন, ‘আমি আর তিশা সেই আড্ডায় বসতাম আর তাঁদের গল্প শুনতাম। মনে হতো যেন ক্লাস করছি।’

তিশা বলেন, ‘অনেকেই ভাবছেন খুব গম্ভীর একটা কিছু হবে, ভারী ভারী ডায়ালগ থাকবে। মোটেও তেমন না ছবিটা। এখানে প্রেম আছে, মজার দৃশ্য ও সংলাপ আছে। দর্শক পূর্ণাঙ্গ বিনোদন পাবেন।’

কাল ৫২টি হলে মুক্তি পাবে ‘ফাগুন হওয়ায়’। তৌকীরের প্রতি বরাবরই অভিযোগ, ছবির প্রচারে তেমন আগ্রহী নন তিনি। আগের ছবিগুলোতেও তেমন প্রচারণা করেননি। একটু বিরক্ত হয়েই বললেন, ‘আমি কেন প্রচারণা করব, আমি কি ক্যানভাসার নাকি! আমি শিল্পী, আমি প্রচারক না।’ একটু থেমে পরে বললেন, ‘এটা আসলে পরিবেশক ও প্রযোজক করবেন। প্রচারণা ডিরেক্টরের কাজ না; যদিও আমাদের দেশে ডিরেক্টররা করে থাকেন। আমি এটা পারি না। এখন সোশ্যাল মিডিয়া বেশ জনপ্রিয়, সেখানে প্রচারণা হতে পারে। পাশাপাশি টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় প্রচার করা হবে। এর বেশি তো আর কিছু করার নেই আমার। আমার যেটা কাজ—ছবি বানানো, সেটাই ঠিকঠাক করার চেষ্টা করেছি।’

 



মন্তব্য