kalerkantho

স্মৃতিতে আনোয়ার

৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



স্মৃতিতে আনোয়ার

১ ডিসেম্বর না-ফেরার দেশে চলে গেলেন সিনেমাটোগ্রাফার-ফটোগ্রাফার আনোয়ার হোসেন। ছয়বার জাতীয় পুরস্কার পাওয়া এই কিংবদন্তি কমনওয়েলথ গোল্ডসহ পেয়েছেন ৬৮টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। তাঁকে নিয়ে স্মৃতির ঝাঁপি খুলেছেন চলচ্চিত্র পরিচালক মসিহউদ্দিন শাকের এবং অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ

 

তাঁকে নিয়ে গর্ব করতাম

মসিহউদ্দিন শাকের

পড়েছি স্থাপত্যকলায়। আনোয়ারও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, একই বিষয়ে আমার দুই ব্যাচ জুনিয়র ছিলেন। ১৯৬৭ সালে চলচ্চিত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হই। তখন আমরা দেশি-বিদেশি প্রচুর ভালো সিনেমা দেখতাম। নিজেরা দেখতাম, অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করতাম। ছবি সংগ্রহ করতাম বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে। ছবি দেখে আমরা আড্ডা দিতাম। কোন ছবিটা কেমন লাগল, মেরিটস-ডিমেরিটস নিয়ে আলোচনা করতাম। পড়াশোনার পাশাপাশি সিনেমা ছিল ধ্যানজ্ঞান। তখন আনোয়ার ফটোগ্রাফিতে খুবই ভালো করছিলেন। তাঁকে নিয়ে আমরা গর্ব করতাম। সে সময়ই দেশ-বিদেশে ছবি পাঠিয়ে দু-একটা পুরস্কারও পেয়েছিলেন। তাঁকে পরামর্শ দিলাম, স্থাপত্যবিদ্যায় পড়ে সবাইকে যে স্থপতি হতে হবে, এমন তো কথা নেই। যেখানে মন টানে সেখানে যাওয়া উচিত। আপনি সিনেমাটোগ্রাফির ওপর কোর্স করতে পারেন। তিনি আমার কথায় সায় দিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সম্ভবত তিনি আর্কিটেকচারে প্র্যাকটিসও করেননি। তখন পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়াশোনার জন্য স্কলারশিপ দেওয়া হচ্ছিল। আমাদের এখান থেকে অনেকেই গেছেন। এর মধ্যে ছিলেন সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকী, সাইদুল আনাম টুটুল, ফরিদুর রহমান, বাদল রহমানরা। আনোয়ারকে বললাম, আপনিও যেতে পারেন। আমার কথা হয়তো তাঁর মনে ধরেছিল। চলে গেলেন পুনে। সেখানে পড়াশোনা করে দেশে ফিরেছেন তিনি। তত দিনে সিনেমা বানানোর সব আয়োজন সম্পন্ন আমার। আমি ও শেখ নেয়ামত আলী ভাই শুটিংয়ে যাব, এর মধ্যেই আনোয়ারকে পেয়ে গেলাম। ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’তে তাঁকেই নিয়ে নিলাম। প্রথম ছবিতেই পেলেন জাতীয় পুরস্কার। পরে তো আরো কাজ করেছেন।

আমরা যে খুব আড্ডা দিতাম, এমন নয়। একে তো তিনি জুনিয়র ছিলেন, তার ওপর আমাদের আড্ডার সার্কেলও ছিল ভিন্ন। তিনিও ঢাকারই ছেলে। পুরান ঢাকায় বড় হয়েছেন। ড. নীলিমা ইব্রাহিমের মেয়ে ডলিকে বিয়ে করলেন। ডলি আমাদের সিনেমার নায়িকা ছিলেন। তিনিও জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। ডলির আগের ঘরে একটি সন্তানও ছিল। ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ করার সময় তাঁদের সখ্য হয়। সে বছরই বিয়ে করলেন। ঘরসংসারও করছিলেন। পরের খবর তো সবারই জানা, ডলি সুইসাইড করেছেন। ঘটনাটা আসলে আমাদের সবার মনেই খুব দাগ কাটে। এরপর কালেভদ্রে হয়তো আনোয়ারের সঙ্গে দেখা হতো। প্যারিসে চলে গেলেন। হঠাৎ বাংলাদেশে কোন অনুষ্ঠানে এসে হাজির। দেখা হলে বলতাম—কী খবর, আনোয়ার? বলতেন, এইতো প্যারিস থেকে এলাম। কোথায় থাকেন? উঠেছেন কোথায়? বলতেন, শরীয়তপুরে বাড়ি করেছেন, সেখানেই থাকেন। আর ঢাকায় কোনো প্রগ্রাম হলে আসতেন। শেষ দেখা হয়েছিল ২৪ নভেম্বর, শেখ নেয়ামত আলী ভাইয়ের ১৫তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে স্মৃতিচারণামূলক সভায়। সভা শেষে এবার অনেক কথাই হয়েছে, আড্ডাও হলো। ওটাই ছিল আমাদের শেষ দেখা।

 

ফটোগ্রাফার হিসেবে বিশ্বখ্যাত

রাইসুল ইসলাম আসাদ

পরিচয় হওয়ার আগে থেকেই তাঁর সম্পর্কে জানতাম। ভালো ফটোগ্রাফি করতেন। সালাউদ্দীন জাকী ভাইয়ের ছবি ‘ঘুড্ডি’ করার সময় পরিচয়। ছবিটিতে তাঁর কাজ করার কথা ছিল। জাকী ভাই পরিচালনায় পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে পড়ে এসেছেন। আনোয়ার ভাইও সেখানে পড়াশোনা করে এসেছেন। ঘটনাচক্রে সিনেমাটি তাঁর করা হয়নি। ডলির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হওয়ার পর আবার যোগাযোগ বাড়ে। ডলি আমাদের ইউনিভার্সিটির, একসঙ্গে নাটক করেছি। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আমাদের। সেই সূত্রে আমাদের ফের পরিচয়। আমি বিয়ে করি ১৯৭৯ সালে। তখন আমার স্ত্রীর পরিবার শান্তিনগরে যে বাসায় থাকত, তার ওপরতলায় থাকত আনোয়ার ভাই ও ডলি। আমার বিয়ে হওয়ার পেছনে ডলি ও আনোয়ার ভাইয়ের অনেক অবদান। বিশেষ করে ডলিই আমার বিয়েটা করিয়েছিল। এটা হলো আমাদের ব্যক্তি সম্পর্ক। শান্তিনগরের সেই বাসায় নিয়মিত যেতাম, তুমুল আড্ডা হতো। ডলি মজা করে আমাকে বলত, ‘আমি কিন্তু তোর শাশুড়ি। প্রতি ঈদে মাকে বাড়িতে সালাম করে এসে আমাকে সালাম করবি এবং ঈদি নিয়ে যাবি।’ সেটা আমি করতামও। শান্তিনগর থেকে ওরা পরে চলে গেল তালতলার এক বাড়িতে। আমার তখন একটা মোটরসাইকেল ছিল। আমি আর আমার স্ত্রী প্রায় সন্ধ্যায় ওটাতে চেপে ওদের বাড়িতে যেতাম। দারুণ একটা সখ্য গড়ে উঠেছিল দুই পরিবারের। আনোয়ার ভাই তো অসম্ভব পড়াশোনা করা মানুষ। ভালো ছাত্রও ছিলেন। কথা বলে তৃপ্তি পেতাম। তিনি সাধারণত বিয়ের ছবি তুলতেন না, কিন্তু আমার বিয়ের ছবি তুলেছিলেন। তখন ঢাকায় অত ফুল পাওয়া যেত না। আল মনসুররা কলকাতা থেকে বিমানে করে ফুল এনেছিল। বিশাল বিশাল ফুলের ঝুড়ি। সেই ফুল দিয়ে সাজানো দেখে তিনি ক্যামেরা নিয়ে আসেন। আমাদের বিয়ের অসম্ভব সুন্দর সুন্দর ছবি তোলেন।

তানভীর মোকাম্মেলের ‘নদীর নাম মধুমতি’র সিনেমাটোগ্রাফার আনোয়ার ভাই। দীর্ঘদিন ধরে ছবির শুটিং হয়েছিল। এরপর তাঁর সঙ্গে একে একে ‘অন্য জীবন’, ‘লাল সালু’, ‘হিল্লা’, ‘লালন’-এর মতো ছবি করেছি। বেশির ভাগেরই শুটিং হয় আউটডোরে। ব্যক্তিজীবনের পর কর্মজীবনেও দারুণ সম্পর্ক হয় আমাদের। এসব মিলিয়েই দীর্ঘ পথচলা। ডলি সুইসাইড করার পর থেকে আমাদের দূরত্ব বাড়তে থাকল। তাঁর সঙ্গে আমার শেষ ছবি ‘লালন’। এরপর খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎও হতো না। এর মধ্যে তিনি প্যারিসে স্থায়ী হলেন। মাঝে মাঝে আসতেন।

১০ বছর আগে সর্বশেষ দেখা হয়েছে। কী কথা হয়েছে সেদিন একেবারেই মনে নেই। এর মধ্যে আমিও অসুস্থ হয়ে তিন বছর বিছানায় ছিলাম। তাঁর মূল্যায়নে বলব, ফটোগ্রাফার হিসেবে তিনি বিশ্বখ্যাত। আমার কেন যেন মনে হয়, ওটাতেই তিনি অসম্ভব পারদর্শী ছিলেন। যদিও তিনি অনেক চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন, জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন; তবে আমি মনে করি, একের পর এক কাজ করলে যে উন্নতিটা হয় সেটা তাঁর হয়নি। তাঁর যে জ্ঞান ও মেধা, সেই হিসাবে অনেক বেশি দেওয়ার কথা ছিল। জানি না, আমাদের দেশের টেকনিক্যাল সমস্যার কারণে সেটা হয়নি, নাকি অন্য কিছু। তবে যতটকু করেছেন, সেটাও তো কম নয়!

অনুলিখন : ইসমাত মুমু

 



মন্তব্য