kalerkantho

শাওনের গান

১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



শাওনের গান

সেরা গায়িকা হিসেবে পেয়েছেন ২০১৬ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। কয়েক দিন আগে ভারতীয় গায়ক নচিকেতার সঙ্গে গেয়েছেন একই মঞ্চে। বেড়েছে গানের ব্যস্ততা। মেহের আফরোজ শাওনকে নিয়ে লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

 

কয়েক দিন আগে কলকাতা গিয়েছিলেন গান গাওয়ার জন্য। সুরমঞ্জরি কর্মকর্তা রত্না সুর কলকাতা থেকে শাওনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। রত্না সুরের আরেকটি পরিচয়, তিনি কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের চিফ হুইপ। দুই-আড়াই মাস আগের কথা। শাওন তখন মাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ির মধ্যে। তাড়াহুড়ায় হেলাফেলায় কথা সারতে হলো। কিন্তু রত্না সুর দমবার পাত্র নন। হোয়াটসঅ্যাপ ও ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ রাখলেন। এর পেছনের কারণ, গত বছর কলকাতায় বাংলাদেশের বইমেলায় শাওনের গান শুনেছেন তিনি। তখনই নাকি ঠিক করেছেন, শাওনকে নিয়ে কলকাতার রবীন্দ্রসদনে একটি অনুষ্ঠান করবেন। শাওনের জন্য দুইবার অনুষ্ঠানের তারিখও পিছিয়েছেন। ‘আমার সময় মিলছিল না। মাঝখানে আমার অন্য কয়েকটি অনুষ্ঠান ছিল। তিনি শেষে জানান, আপনার সঙ্গে তো একজন সহশিল্পী আছেন। একই সঙ্গে গান গাইবেন নচিকেতা। উনার দিনটাও তো আপনার সঙ্গে মেলাতে হবে। নামটা শুনে বুকের মধ্যে ধপাস করে উঠল। সিক্স-সেভেনে পড়ার সময় থেকে যাঁর গান শুনে আসছি, যাঁর গান শুনে বড় হয়েছি, যাঁর গান শুনে মন কেমন কেমন করত, তাঁর সঙ্গে এক স্টেজে গাইব! আমরা যারা নাইন্টিজের প্রজন্ম, আমাদের মধ্যে ওপার বাংলার নচিকেতা, কবির সুমন, অঞ্জন দত্ত—এঁদের গানের প্রতি একটা অন্য রকম টান ও ভালোবাসা ছিল। একটু নিজের বদনাম করেই বলি। আমার তখন নিজের আরো অনেক কাজ। অনেকের কাজ বন্ধ করে অনুষ্ঠানটিতে গাইতে রাজি হই।’—বললেন শাওন।

শাওন জীবনে প্রথম কলকাতায় গিয়েছিলেন ১৯৯২-৯৩ সালের দিকে। তখন মা-বাবা প্রথম রবীন্দ্রসদনে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কলকাতায় যে জায়গাগুলোতে শিল্প-সাহিত্যের চর্চা হয়, ওই স্থানগুলো ছিল শাওনদের পরিবারের বেড়ানোর জন্য খুবই প্রিয়। ‘আমি প্রথম এবং পরবর্তী সময়েও যখন রবীন্দ্রসদন দেখি, আমার কখনোই মাথায় আসেনি যে এই রবীন্দ্রসদনের মূল মঞ্চে বিশেষ অতিথি হয়ে আমি গাইতে পারব। সেই রবীন্দ্রসদনে গান গাইলাম। চারপাশে বড় বড় বিলবোর্ড। সেখানে আমার ছবি, নচিকেতার ছবি। খুব একটা অন্য রকম ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল।’

আর নচিকেতার সঙ্গে গাওয়ার অভিজ্ঞতা? ‘আমি সেই শৈশবে যেমন নচিকেতাকে পেয়েছি, এখনো তিনি তেমনটাই আছেন। অথচ উনার বয়স নাকি পঞ্চাশ পার হয়েছে। তাঁর সঙ্গে ব্যাকস্টেজে কথা হচ্ছিল। জানালেন, ২০১২ সালের পর হুমায়ূন আহমেদ পড়া শুরু করেছেন। খুব আফসোস করে বলছিলেন, আগে কেন হুমায়ূন পড়িনি? কেন তাঁর সঙ্গে দেখা করিনি। এমন মানুষের সঙ্গে দেখা না হওয়াটা আমার জীবনে একটা অপ্রাপ্তি রয়ে গেল। উনি এত ডিটেইলস হুমায়ূন আহমেদ পড়েছেন এবং সেটা এত সুন্দর করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সত্যিই আমি অভিভূত। এত সিনিয়র একজন শিল্পী। যখন এলেন ঘোষণা হলো, শাওন আমাদের অতিথি, উনাকে ফুল দিয়ে বরণ করবেন নচিকেতা। তিনি স্টেজে উঠে সুন্দর করে আমাকে বরণ করেছেন। এই যে শিল্পীর এতটা বিনয়, সহশিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, এটা আসলে আমাদের নতুন করে কিছু শেখায়।’

হুমায়ূন আহমেদের অন্যতম প্রিয় শিল্পী ছিলেন শাওন। তাঁর গান মুগ্ধ হয়ে শুনতেন মিসির আলীর লেখক। এ প্রসঙ্গে শাওন বলেন, ‘আমি একটা কথাই বলব, হুমায়ূন আহমেদ যে পরিমাণ গান লিখেছেন, আমি যদি না গাইতাম, উনি এতটা লিখতেন না। হুমায়ূন আহমেদ অল্প কিছু গান তাঁর সিনেমার জন্য লিখেছেন। তাঁর গানের সংখ্যা যে এত বেশি, এর পেছনের অন্যতম কারণ আমি গান গাই এবং আমার গান উনার ভীষণ পছন্দ ছিল। শুধু আমি গাই বলেই উনি এত গান লিখেছেন।’

তার পরও তো আপনাকে সেভাবে গানে পাওয়া যায়নি। কেন? ‘কারণ কিভাবে বেশি গান শোনানো যায়, সেটা আমি জানি না। বর্তমান সময়ে খুব সম্ভবত গান বেশি শোনানোর জন্য দরকার ইউটিউব ভিডিও। আমার কোনো ইউটিউব চ্যানেল নেই, তার ওপর আমি কোনো মিউজিক ভিডিও বানাইনি। তবে এবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার পর অনেকেই খুব আগ্রহ দেখাচ্ছে নতুন গানের জন্য।’

সেই আগ্রহের জায়গা থেকে এবার কলকাতায় গিয়ে নচিকেতার সুর ও জুলফিকার রাসেলের কথায় ‘ইলশে গুঁড়ি’ নামে একটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। আর বাংলাদেশে শাহরিয়ার নাজিম জয়ের পরিচালনায় ‘পাপ কাহিনী’ সিনেমায় ‘আহারে’ শিরোনামের একটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। গানটির কথা লিখেছেন জয় নিজেই আর সুর করেছেন শান। আরেকটি হাসিবুর রেজা কল্লোলের পরিচালনায় নতুন ছবির গান। এটার কথা লিখেছেন কল্লোল আর সুর ও সংগীতায়োজনে বাপ্পা মজুমদার। 

জাতীয় পুরস্কার পাওয়া নিয়ে বলেন, “যে গানের জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি, সে গানের জন্য পুরস্কার শ্রোতাদের কাছ থেকে আমি অনেক আগেই পেয়েছি। ‘যদি মন কাঁদে চলে এসো এক বরষায়’ গানটি নিয়ে শ্রোতাদের ভালোবাসা, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, ওয়েলকাম টিউন, রিংটোনে এত শুনেছি। একটি গান যে শিল্পীকে শ্রোতার এত কাছাকাছি আনতে পারে এটা অবিশ্বাস্য। এটা ঠিক, রাষ্টীয় স্বীকৃতি মানুষের দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। আমি যে আবার নতুন করে বেশি বেশি গান গাইছি এটা সেই দায়িত্ব থেকেই।”

গান নিয়ে সামনে নতুন কোনো পরিকল্পনা? ‘আমার নিজেকে নিয়ে কখনো কোনো পরিকল্পনা থাকে না। অন্যরা আমাকে নিয়ে পরিকল্পনা করে। আমি সেখানে গিয়ে শামিল হই। ’

হুমায়ূন আহমেদের গানগুলো নিয়ে নতুন কোনো পরিকল্পনা? “তাঁর গানগুলো এবং পেছনের গল্প নিয়ে গত বছর একটি বই বের করলাম—‘নদীর নাম ময়ূরাক্ষি’। আর যে গানগুলো অন্যরা গেয়েছেন সেগুলো নিয়ে নতুন কোনো পরিকল্পনা নেই। অরিজিনালের একটা নস্টালজিক ব্যাপার আছে। সেটা নতুন করে গাওয়ার সময় এখনো আসেনি। হয়তো অনেক বছর পর করা যেতে পারে। তবে হুমায়ূন আহমেদের গানগুলো নিয়ে গানের ভিডিও নতুন করে তৈরি করা যায়।”

অন্য কেউ যদি তাঁর লেখা গান গাইতে চায়? ‘সঠিক নিয়ম-কানুন মেনে অনুমতি নিয়ে অবশ্যই গাইতে পারে। আমি তো মনে করি, এটা লালনসংগীত বা অন্যান্য যে সংগীত আছে তার মতো একটা জায়গা পাবে। আমি হুমায়ূন সংগীতই বলি। হুমায়ূন আহমেদের গানগুলোর স্বরলিপি করার ইচ্ছা আছে। এটা করলে যাদের কিছু কনফিউশন আছে সেটা দূর হয়ে যাবে।’—জানান শাওন।



মন্তব্য