kalerkantho


অভিনয়ে ‘বাশার’ পরিবার

ঢাকা থিয়েটারের প্রবীণ দুই সদস্য ফখরুল বাশার মাসুম ও মিলি বাশার। এখনো নিয়মিত অভিনয় করছেন, হচ্ছেন মডেল। তাঁদের মেয়ে নাজিবা বাশারও হাঁটছেন মা-বাবার পথেই। তাঁদের কথা শুনেছেন মীর রাকিব হাসান

১৯ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



অভিনয়ে ‘বাশার’ পরিবার

১৯৭৪ সালে দেশের অন্যতম নাট্য সংগঠন ঢাকা থিয়েটারে যুক্ত হন মাসুম। তিন বছর পর যুক্ত হন মিলি।

দলের হয়ে মাসুম প্রথম মঞ্চে ওঠেন ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’ নাটকে। অন্যদিকে মিলি প্রথম মঞ্চে ওঠেন ‘শকুন্তলা’ নাটকে। হুমায়ুন ফরীদি অভিনীত প্রথম মঞ্চনাটকও এটি। সেলিম আল দীন নতুন এই নাটকটি নিয়ে এলেন। মহড়া শুরু হলো। অনেক নতুন শিল্পী দরকার। ফরীদি, মিলিরা তখন যোগ দিলেন দলে। মিলিকে দেখে মাসুমের মনে ভালোবাসার ডালপালা ছড়াতে শুরু করল। এভাবে বছর তিনেক গেল। ‘সেই সময় তো নাটকের দলে মেয়েদের সংখ্যা ছিল খুব কম। চিন্তায় পড়ে গেলাম, আমি প্রপোজ করি আর সে যদি আমাকে বারণ করে দেয়, আর যদি দলে না আসে! দলে না এলে তো দোষটা আমার ঘাড়ে পড়বে। তখন তো বাচ্চু ভাই [নাসির উদ্দীন ইউসুফ] আমাকে ছাড়বে না। দলে আমার বন্ধু সুবর্ণা মুস্তাফা, তাকে বললাম ঘটনা। সুবর্ণাই সব কিছু ঠিক করে দিল। তারপর তো বিয়ে-সংসার’—বললেন মাসুম। একটা সময় জীবিকার প্রয়োজনে পাড়ি জমান সৌদি আরবে। ২৬ বছর পর স্থায়ীভাবে দেশে ফেরেন ২০১২ সালে। ফিরেই টিভি নাটকে অভিনয় শুরু করেন। আফজাল হোসেনের ধারাবাহিক ‘ছোট কাকু’ দিয়ে শুরু। সৌদি আরবে থাকলেও সংস্কৃতিকচর্চা থেকে দূরে ছিলেন না। ‘ওখানে তো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বলতে গেলে নিষিদ্ধই। বাংলাদেশ দূতাবাসের যাঁরা কর্মকর্তা ছিলেন, তাঁরা আমাদের খুব সহযোগিতা করেছেন। আমাদের বাসায় সব অনুষ্ঠানের রিহার্সাল হতো। আমি নিয়মিত গাইতাম। ওখানে আমরা পৌষ মেলা করেছি, বৈশাখী মেলা করেছি। বিশেষ দিবসগুলোতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকত। নাটকও মঞ্চায়ন করিয়েছি। ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গেও যোগাযোগ থাকত সার্বক্ষণিক। আমাদের সুবিধা ছিল, বছরে এক-দুবার পরিবারসহ দেশে আসতাম। ছুটির সময়টা ঢাকা থিয়েটারেই পড়ে থাকতাম’—বললেন মিলি বাশার।

এই দম্পতির দুই মেয়ে। নাবিলা বড়, ছোট নাজিবা। বড় মেয়ের ‘এ লেভেল’ শেষ হওয়ার পর দুই মেয়েকেই দেশে পাঠিয়ে দেন। সময়-সুযোগ করে বাংলাদেশ টু সৌদি আরব করেছেন মা-বাবা। ২০১২ পর্যন্ত এভাবেই চলছিল। এর মধ্যে নাজিবার ‘এ লেভেল’ শেষ হলো। নাবিলা চলে গেলেন মালেয়শিয়া, গ্রাফিক ডিজাইনের ওপর পড়তে। নাজিবা কাজ শুরু করলেন ডেইলি স্টারে, সঙ্গে অভিনয় ও নাচ চালিয়ে নিচ্ছিলেন। ‘অভিনয়ে চার বছর হলো। সুবর্ণা মুস্তাফা আমার মা-বাবার বন্ধু। ছোটবেলা থেকেই আমাকে চিনতেন—নাচ করি, সাংবাদিকতায় আছি। তিনি দেখতে চাইছিলেন অভিনয়ে আমি কেমন করি। তখন বদরুল আনাম সৌদ ধারাবাহিক নাটক ‘এলেবেলে’ করছিলেন। আমার ডাক পড়ল। সেই যে শুরু হলো, এখনো করছি’—বললেন নাজিবা।

মেয়ে নাজিবাসহ মা-বাবা তিনজনই এখন অভিনয়ে নিয়মিত। বদরুল আনাম সৌদের ছবি ‘গহীন বালুচর’-এর কোরিওগ্রাফারও নাজিবা। নাটক, বিজ্ঞাপন, সিনেমার পাশাপাশি ঢাকা থিয়েটারে পারফর্ম করেন মাসুম এবং দলের নতুন সদস্যদের সময় দিয়ে থাকেন। মঞ্চের কী অবস্থা? ‘এখন মঞ্চে দর্শক রেসপন্স বেশ কম। আমার মনে আছে, মহিলা সমিতিতে একসময় টিকিট কালোবাজারি হতো। আমরা যখন শুরু করি, তখন মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকিট বিক্রি করতে হতো। এখন আবার সে রকম একটা পর্যায় চলে এসেছে। এখন যারা মঞ্চে কাজ করে, তাদের অনেকের মধ্যেই ডেডিকেশনের অভাব। এর পেছনে আর্থ-সামাজিক অবস্থা দায়ী। ছেলেমেয়েদের দোষও দিতে পারছি না। এখনকার সময়ে প্রত্যেকটা ছেলেমেয়ের অর্থনৈতিক অবস্থাটা বিবেচনায় আনতে হয়, যা আমাদের সময় ছিল না’—বললেন মাসুম।

মিলি বললেন টিভি নাটক নিয়ে, ‘টিভি নাটকে মাঝে খারাপ সময় গেছে। এখন ক্রমাগত ভালোর দিকেই যাচ্ছে। গেল দুই ঈদে অনেক ভালো নাটক দেখলাম। ’

বড় মেয়ে নাবিলা বিদেশ থেকে ফিরে আফজাল হোসেনের বিজ্ঞাপনী সংস্থা মাত্রায় যোগ দিয়েছেন। দুই মেয়েকে নিয়েই বললেন মিলি, ‘পরিবারের ভেতরে যদি একটা পরিবেশ তৈরি করা যায়, তাহলে কিন্তু বাচ্চাদের ওপর খুব প্রেসার দিতে হয় না। ওরা নিজেরাই বুঝতে পারে কী করতে হবে। আমাদের ব্যাপারগুলোও হয়েছে তা-ই। আমরা ওদের শিখিয়েছি—তোমরা মেয়ে নও, মানুষ। ’

নাজিবা যোগ করলেন, ‘আমার বড় বোন আঁকাআঁকি পছন্দ করতেন, তিনি সেখানেই ক্যারিয়ার গড়েছেন। আমিও তেমনি নাচের সঙ্গে আছি, অভিনয়ও করছি। আমরা আসলে বড় হয়েছি এভাবেই। আমার বয়স যখন দুই মাস, তখন থেকে টানা ১৪ বছর সৌদি আরবে ছিলাম। বিপরীত একটা কালচারের মধ্যেও আমাদের গানের স্কুল, নাচের টিচার ঠিক করে দিয়েছেন মা-বাবা। আমি আর আমার বোন যতটা কালচারালি ইনভলভড ছিলাম, হয়তো দেশের অনেক ছেলেমেয়ে সেটা পারে না। আমরা জন্মগতভাবে যে সংস্কৃতি পেয়েছি, এখনো সেটাই লালন করছি। ’


মন্তব্য