kalerkantho


দুই দশকের শিরোনামহীন

১৯৯৬ সালের ১৪ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে শিরোনামহীন। গত মাসে দুই দশক পূর্ণ করেছে ব্যান্ডটি। লিখেছেন রবিউল ইসলাম জীবন। ছবি তুলেছেন মঈন অভি

২৬ মে, ২০১৬ ০০:০০



দুই দশকের শিরোনামহীন

শুরুর গল্প শোনালেন জিয়া

১৯৯৬ সালের কথা। আমি তখন ‘থ্র্যাশহোল্ড’ নামে একটা ব্যান্ড করি। আমাদের বাসার পাশেই ছিল বুলবুল ভাইয়ের বাসা। তিনি ছিলেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। পাশাপাশি গান করতেন। অন্যদিকে আমার সঙ্গে নিয়মিত গিটার বাজাতেন জুয়েল। তিনজনের প্রায়ই দেখা হতো, গান নিয়ে আড্ডা হতো। এভাবেই একসময় ব্যান্ডের ভাবনাটি আসে। অ্যালবাম করব, জনপ্রিয় হব—এসব তখন মাথায় ছিল না। জাস্ট ভালো লাগা থেকেই শুরু করা।

বুলবুল ভাই ভালো গাইতেন বলে তাঁকে দেওয়া হয় ভোকালের দায়িত্ব। গিটারে জুয়েল আর আমি। দুজনই তখন অ্যাকুস্টিক বাজাতাম। গান লেখা আর সুরের কাজটাও ছিল আমার। বানাতে বানাতে প্রায় ৫০টির মতো গান জমে। আশপাশের লোকজন এবং বন্ধু সার্কেলে কিছু গান ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে গানের কথার জন্য সবাই আমাদের প্রশংসা করতে থাকে। আমাদের গান শুনে একদিন পদাতিক নাট্য সম্প্রদায় প্রস্তাব দেয় টিএসসি অডিটরিয়ামে তাদের একটি শোয়ের আগে গান করতে। মৌলিক গান দিয়েই সেখানে আমরা নিজেদের উপস্থাপন করি। এটাই ছিল প্রথম কোনো অনুষ্ঠানে আমাদের অংশগ্রহণ। দিনটি ছিল ১৪ এপ্রিল। সে অনুষ্ঠানেই ‘শিরোনামহীন’ নামটি দেওয়া হয়। আর তাই এ দিনেই আমরা জন্মদিন পালন করি।

ভাঙা গড়ার খেলা

বছর চারেক এভাবেই চলে শিরোনামহীন। তবে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গানের ভক্ত বুলবুল ব্যান্ডের ভোকাল হিসেবে নিজেকে মানাতে পারছিলেন না। তিনি চলে গেলে ব্যান্ডে ভোকাল হিসেবে যোগ দেন মহিন। ২০০০ সালের পুরো সময়টা ব্যান্ডটির সঙ্গে ছিলেন তিনি। এ বছর ‘স্টার সার্চ : বেনসন অ্যান্ড হেজেস’ প্রতিযোগিতায় রানার্সআপ হয় শিরোনামহীন। এক বছর পর দেশের বাইরে চলে যান মহিন। ২০০০ সালের ডিসেম্বরে মহিনের স্থলাভিষিক্ত হন ব্যান্ডটির বর্তমান ভোকাল তুহিন। ২০০২ সালে ফারহান (সরোদ), তুষার (গিটার) ও শাফিনকে (ড্রামস) নিয়ে লাইনআপটা দীর্ঘ করা হয়। ফলও আসে। তিন বছর কাজের পর ২০০৪ সালে আসে ব্যান্ডটির প্রথম একক অ্যালবাম ‘জাহাজী’। অ্যালবামটি বের হওয়ার কিছুদিন পরই পিএইচডি করতে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান ফারহান। এর পর থেকে সরোদ বাজানোর কাজটা জিয়া ও শাফিনই করতে থাকেন। ২০০৮ নতুন সদস্য রাজীব (কি-বোর্ড) নিয়ে ‘বন্ধ জানালা’র কাজ শুরু করে শিরোনামহীন। ২০০৯ সালে তুষারের পরিবর্তে দিয়াত এবং ২০১০ সালে রাজীবের পরিবর্তে ব্যান্ডে যোগ দেন রাসেল। তারপর থেকে বর্তমান লাইনআপেই চলছে।

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

জিয়া বলেন, ‘গান করে এত পরিচিতি হবে কিংবা এত দূর আসব এ হিসাব কখনো করিনি। বরং ভালোবাসা থেকে কাজটা করে গেছি। গত ২০ বছরে আমরা শ্রোতাদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি, সম্মান পেয়েছি সেটা অনেক বড় বিষয়। একটা ব্যান্ড নিয়ে একসঙ্গে এতগুলো বছর পার করে দেওয়াটাও কম কথা নয়। সবার আগ্রহ ও ব্যান্ডের প্রতি আন্তরিকতা ছিল বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। গানের কল্যাণেই আমরা পুরো দেশটা ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছি, মানুষের খুব কাছে যেতে পেরেছি।’

মন খারাপের গল্প

ব্যান্ড করতে গিয়ে মন খারাপের অনেক গল্পও জমা হয়েছে। পাইরেসির কারণে নিজেদের প্রাপ্যটা ঠিকমতো বুঝে না পাওয়ার হতাশা আছে। আছে অর্থনৈতিক কারণে মিউজিকটাকে প্রফেশনালি নিতে না পারার কষ্ট। আর তাই তো শিরোনামহীনের সব সদস্যকে অন্য পেশার পরই গানে সময় দিতে হয়।

তবে এসব ছাড়িয়ে অন্য এক অভিমানের কথা জানালেন জিয়া, ‘আমাদের দেশে গানের ক্ষেত্রে সব কৃতিত্ব ভোকালেরই। গানগুলো যাঁরা তৈরি করেন তাঁরা সব সময় অন্ধকারেই থেকে যান। টিভিতে যখন একটা শো হয় তখন ৯৯ ভাগ সময়ই ক্যামেরাটা ভোকালের দিকে জুম করা থাকে। বিনোদন পাতাগুলোতেও ভোকালকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। শ্রোতারাও ব্যান্ডের গানকে ভোকালের গান হিসেবেই জানে। অথচ একটি গান তৈরিতে সবার অবদান থাকে। যিনি সৃষ্টি করবেন তিনি যদি প্রাপ্য সম্মানটা না পান তাহলে তো সৃষ্টির আগ্রহই হারিয়ে ফেলবেন!’



মন্তব্য