kalerkantho

আমার লালন

নিগার সুলতানা সুমী

১৪ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



আমার লালন

লালনের গান নিয়ে লালন ব্যান্ড করব, এমন ভাবনা মনের মধ্যে কখন বাসা বেঁধেছে ঠিক মনে পড়ে না। শুরুতে লালনের গানে শুধু ভালো লাগাটাই ছিল। সাঁইজির দর্শনের দিক থেকে বলতে গেলে বোঝা না বোঝার জ্ঞান বা বোধ কোনোটাই ছিল না তখন। তবে শৈশব থেকেই পারিবারিক সূত্রে সংগীতের সঙ্গে সম্পর্ক ও এই পর্যন্ত আসা।

ছোটবেলা থেকেই মানুষের সঙ্গে মেশার সহজাত একটা গুণ আমার, ভীষণ দুঃসাহসী ছিলাম। মফস্বলের একটি বড় শহরে বড় হওয়া নারী হিসেবে গতানুগতিক জীবন ধারার বাইরে একজন মানুষ হিসেবে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার ইচ্ছা ছিল বরাবরই। এটা থেকেই মূলত ব্যান্ড ‘লালন’-এর উত্পত্তি।

লালন সংগীত বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি আলোচনার বিষয়। এ জন্য প্রয়োজন ছিল আধুনিক যন্ত্রে লালনের গানকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা। লালন সংগীতকে বিশ্বে আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই প্রয়োজন ছিল আধুনিক বাদ্যযন্ত্রে সাঁইজির সংগীত আয়োজনের।

লালন সংগীতকে বিশ্বে আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই প্রয়োজন ছিল আধুনিক বাদ্যযন্ত্রে সাঁইজির সংগীত আয়োজনের

সাঁইজির গানে মানুষের সহজ জীবন ধারার কথা। জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার ঊর্ধ্বে মানবধর্ম। এই মানব দেহেই সেই মানুষের বসবাস। তাই সাঁইজি বলেছেন, ‘সহজ মানুষ ভজে দেখ না রে মন দিব্যজ্ঞানে, পাবি রে অমূল্যনিধি বর্তমানে।’

আমি নিজে মনে করি লালন সাঁইয়ের দর্শন ব্যাখ্যা করা আমার মতো অধমের পক্ষে অসম্ভব। ব্যাখ্যা আমি নিজেই খুঁজে বেড়াচ্ছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার উপলব্ধি তুলে ধরার চেষ্টা করি মানুষকে গান শুনিয়ে। ছোট্ট একটি সংগীত প্রচেষ্টা আলোচনা ও সমালোচনা ছাড়া কখনোই ভালো এবং সমৃদ্ধ হতে পারে না।

বিশ্ব দরবারে ও শ্রোতাদের মধ্যে সাঁইজির গান কতটুকু পৌঁছে দিতে পেরেছি বা তাঁর গানের মর্মবাণী আমাদের গায়কির মধ্য দিয়ে শ্রোতারা কতটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছে তা বলতে পারব না। তবে যখন বিদেশিরা সাঁইজির গান শোনার সময় অবাক বিস্ময় নিয়ে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করে তখন আমরাও বিস্মিত হই। লালনের প্রতি মুগ্ধতা আরো বাড়ে। মনে ভীষণ ভালো লাগার তোলপাড় অনুভব করি।

বিদেশি শ্রোতারা আগ্রহ ও বিস্ময় নিয়ে শুনছে আমাদের গান—এটা কম পাওয়া নয় ব্যান্ড লালনের। ২০১৪ সালের ৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বিশেষ কনসার্ট—‘সেটিং দ্য স্টেজ ২০১৫ অ্যান্ড বিয়ন্ড’-এ অংশ নিয়ে আমরা বাংলা গানকে পৌঁছে দিয়েছি পুরো বিশ্বের মানুষের কাছে। সেখানে আমরা বলেছি, ‘পৃথিবীর বুকে আমরা দাঁড়িয়ে নেই এখন আর, বরং পৃথিবীটা আমাদের বুকে দাঁড়িয়ে। এই পৃথিবীকে আমরা আমাদের নিজেদের মনের মতো করে সাজাব।’ মনে আছে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এই কনসার্টে হাজির ছিলেন। আমরা সেখানে ‘আমি অপার হয়ে বসে আছি’, ‘জাত গেল, জাত গেল’ ও ‘পাগল’ গেয়ে শোনাই। সাঁইজির গানের রেশ দাগ কেটে যায় বান কি মুনের মনে। তিনি এগিয়ে এসে আমাদের শুভেচ্ছা জানান।

সাঁইজিকে নিজের ভেতর কতটুকু ধারণ করি এটা বলা আমার জন্য কঠিন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর গান গাই। এখনো ডুবে থাকি সাঁইজির গানে। তাঁর বহু গান সাধারণ শ্রোতাদের নাগালের বাইরে। এমনকি অনেক গানের সুর খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমরা সেই গানগুলো ব্যান্ডের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। কখনোই ব্যান্ড লালন নিজেদের জনপ্রিয়তার পেছনে ছোটেনি। চেষ্টা করেছে আড়ালে থেকে নিজেদের মতো করে কাজ করতে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য সাঁইজির গানকে নিজেদের মতো করে তুলে ধরা।   

অনুলিখন : আতিফ আতাউর



মন্তব্য