kalerkantho


বিদায় শাম্মী আক্তার

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিদায় শাম্মী আক্তার

শাম্মী আক্তার [১৯৫৭-২০১৮]

স্মৃতিচারণা

১৬ জানুয়ারি বিকেলে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী শাম্মী আক্তার। তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন সহকর্মীরা

 

এমন কণ্ঠ আর পাব না

গাজী মাজহারুল আনোয়ার গীতিকার

সংগীত পরিচালক সত্য সাহা আর আমি তখন অবিচ্ছেদ্য অংশ। গান নিয়েই আমাদের ধ্যানজ্ঞান। তখন সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা আমাদের গানে নিয়মিত। হঠাৎ একদিন সত্যদাকে বললাম, আমাদের গানগুলো কেমন যেন একরকম হয়ে যাচ্ছে; ভিন্নতা দরকার। শিল্পীর ক্ষেত্রেও ভিন্নতা প্রয়োজন। তখন আকরামুল ইসলামের সঙ্গে আমাদের ভালো পরিচয়। তিনিও শিল্পী। বিয়ে করেছেন শাম্মী আখতারকে। একদিন পারিবারিক অনুষ্ঠানে শাম্মীর গান শুনলাম। দারুণ লাগল। তখন ‘অশিক্ষিত’ ছবি শুরু হবে। সত্যদাকে বললাম শাম্মীর কথা। ছবিতে শাম্মীকে দিয়ে ‘আমি যেমন আছি তেমন রব বউ হব না রে’ ও ‘ঢাকা শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে’ গান দুটি দারুণ জনপ্রিয়তা পেল। শাম্মীও রাতারাতি তারকা হয়ে গেল। এর পর থেকে শাম্মীর পরিবার, আমার পরিবার আর সত্যদার পরিবার এক বন্ধনে বাঁধা পড়ল। কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠান হলেই একসঙ্গে হতাম। গান হতো, আড্ডা হতো। আজ শাম্মী নেই, তার জন্য মায়া লাগছে। সে আমার খুব আদরের বোন ছিল। শেষের দিকে শাম্মীকে বড় অবহেলা করা হলো। তার ক্যারিয়ারে যখন ভাটি লাগল, একে একে সবাই সরে গেল। কেউ খোঁজখবর নেয়নি। এ রকম কথা ছিল না। শাম্মী বেশি গান গাওয়ার সুযোগ পায়নি। তবে কমসংখ্যক হলেও জনপ্রিয় গানের তালিকা দীর্ঘ। তার কণ্ঠে অসম্ভব রকমের ফোক মেলোডির মিশ্রণ ছিল। এমন কণ্ঠ আমরা আর পাব না।

 

বড় ক্ষতি হয়ে গেল

মো. খুরশীদ আলম সংগীতশিল্পী

শেষ পাঁচটা বছর তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছেন। কখনো ভেঙে পড়েননি। তাঁর মনোবল ছিল। শাম্মী শুধু একজন সহশিল্পী ছিলেন না, ছিলেন পরিবারের মানুষ। তাঁর সঙ্গে অনেক গান গেয়েছি। বেশির ভাগই জনপ্রিয়, এখনো কালজয়ী। তাঁর কণ্ঠে জাদু ছিল। তিনি ফোক ও মেলোডিকে এত সুন্দরভাবে আয়ত্তে এনেছিলেন, অন্য শিল্পীদের কাছে সেটা ঈর্ষণীয় ছিল। আমরা প্লেব্যাকে আর এমন শিল্পী পাব না।

 

বলতেন, আমার ভাইটি কেমন আছে?

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল সংগীত পরিচালক

তাঁর মতো এত ভালো মানুষ জীবনে খুব কম দেখেছি। যখনই ফোন করতেন, বলতেন—আমার ভাইটি কেমন আছে? ‘ভাইটি’ শব্দটা এখন কানে বাজছে। এত মধুর সুরে কথাটি বলতেন না! তিনি কিন্তু এভাবেই সবাইকে আদর করে ডাকতেন। তাঁর সঙ্গে আমি অনেক কাজ করেছি। সংগীত পরিচালক হওয়ার আগে আমি যখন বেহালা বাজাতাম, তখনই তো শাম্মী আক্তার প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। তাঁর সামনে-পেছনে বসে অনেক যন্ত্রসংগীত করেছি। তিনি সত্য সাহার গান বেশি গাইতেন। আমি সত্য সাহার সহকারী ছিলাম। তো, আমিই তাঁর বাসায় গিয়ে খবর দিয়ে আসতাম। কত আদর-যত্ন করে খাওয়াতেন! সেই মানুষটা চলে যাওয়ায় খুব কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু কিছু তো করার নেই।

 

 

জনপ্রিয় ১০ গান

ঢাকা শহর আইসা আমার : ‘অশিক্ষিত’ [১৯৮০] ছবির গান।

সত্য সাহার সুরে এই ছবিতেই প্রথম প্লেব্যাক করেন। দারুণ জনপ্রিয় হয় গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা গানটি। ঢাকার রাস্তায় নায়িকা অঞ্জনার লিপে গানটি মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

 

আমি যেমন আছি তেমন রব বউ হব না রে : এটিও ‘অশিক্ষিত’ ছবির গান। অভিষেকেই জোড়া হিট দিয়ে প্লেব্যাকে নিজের আসন পাকা করেছিলেন গায়িকা।

 

আমি তোমার বধূ তুমি আমার   স্বামী : ‘আরাধনা’ [১৯৭৯] ছবির গান। পরে কণ্ঠ দিলেও ছবিটি ‘অশিক্ষিত’র আগে মুক্তি পায়। কথা মুকুল চৌধুরী, সুর আলম খান। পর্দায় ছিলেন কবরী সারোয়ার।

 

বিদেশ গিয়া বন্ধু তুমি আমায় ভুইল না : ‘উজান ভাটি’ ছবির গান। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথা ও সত্য সাহার সুরে বেশ কয়েকটি গান গেয়েছেন শাম্মী। এটি তাঁর একটি।

 

আমার নায়ে পার হইতে লাগে ষোলো আনা : ‘মাটির ঘর’ [১৯৭৯] ছবিতে সুবীর নন্দীর সঙ্গে দ্বৈত।

কথা গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুর সত্য সাহা। ঠোঁট মিলিয়েছিলেন রাজ্জাক-শাবানা।

 

মনে বড় আশা ছিল তোমাকে

শোনাব গান : ‘ছোট মা’ ছবির গান। কথা মুকুল চৌধুরী, সুর আলম খান। হালের সব টিভি লাইভে গানটি গাইতেন শাম্মী।

 

আমি বৃষ্টিতে ভেজা রজনীগন্ধা : বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে শাম্মী বলেছেন, আধুনিক এ গানটি তাঁর নিজের খুবই পছন্দের। সুরকার শেখ সাদী খানের সঙ্গে করা অন্যতম সেরা কাজ বলেও অভিহিত করেছেন। কথা লিখেছেন নজরুল ইসলাম বাবু।

 

এই রাত ডাকে এই চাঁদ ডাকে : ‘কাজল লতা’ ছবিতে

সুবীর নন্দীর সঙ্গে দ্বৈত গানটি হয়ে উঠেছিল সে সময়ের অন্যতম রোমান্টিক গান। মোহাম্মদ রফিকুজ্জামানের কথায় সুর করেন খোন্দকার নুরুল আলম।

 

আমার মনের বেদনা বন্ধু

ছাড়া জানে না : ‘সোনাই বন্ধু’ ছবিতে অঞ্জু ঘোষের ঠোঁটে এই দুঃখের গানটি একসময় মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে।

 

ভালোবাসলেও সবার সাথে ঘর বাঁধা যায় না : ‘ভালোবাসলেই ঘর বাধা যায় না’ [২০১০] ছবির গান।

মাহফুজুর রহমান মাহফুজের কথায় শেখ সাদী খানের সুরে গানটি নতুন করে এই সিনেমায় ব্যবহার করা হয়। গানটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান শাম্মী আক্তার।



মন্তব্য