kalerkantho


নিজের জন্য কিছুই করিনি

তিনি ‘মঞ্চকুসুম’, মঞ্চই তাঁর বাড়িঘর। মঞ্চে হাসেন, মঞ্চেই কাঁদেন। এই অভিনেত্রী-গায়িকার আজ ৬০তম জন্মদিন। জন্মদিনে শিমূল ইউসুফের মুখোমুখি হয়েছেন দাউদ হোসাইন রনি

২১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নিজের জন্য কিছুই করিনি

মঞ্চে শিমূল ইউছুফ

৬০তম জন্মদিন মানে তো বিশেষ কিছু। বিশেষ কোনো আয়োজন করছেন নিশ্চয়ই?

কিছুই করছি না। কারণ আমার শরীরটা ভালো না। ৩ তারিখ থেকে জ্বর আর ঠাণ্ডায় ভুগছি।

আপনার দল ঢাকা থিয়েটার নিশ্চয়ই কিছু করবে?

ওরাই তো প্রতিবার করে। এবারও হয়তো করবে।

আপনাকে আগে থেকে জানানো হয় না? নাকি সারপ্রাইজ দেবে বলে চুপচাপ...

প্রতিবারই ওরা আমাকে ‘সারপ্রাইজ’ দেয়। কেক নিয়ে আসে, একসঙ্গে কাটি, খাইদাই—এ রকম।

আপনি পাঁচ বছর বয়স থেকে গাইছেন, অভিনয় করছেন। এখন তো ৬০ বছর হয়ে গেল। পেছনে তাকালে কোন অর্জনগুলো চোখে ভেসে ওঠে?

ব্যক্তিগত অজর্নগুলোকে সেভাবে দেখি না। আমি বলব মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কথা। উচ্চাঙ্গসংগীতের শিল্পী ছিলাম। থিয়েটারে আসায় জীবনের মোড়টা ঘুরে গেছে।

সেলিম আল দীন আপনাকে মঞ্চকুসুম উপাধি দিয়েছিলেন। কোন পারফরম্যান্সের পর উপাধিটি পেয়েছিলেন, মনে আছে?

কোনো নির্দিষ্ট পারফরম্যান্সের কারণে না। তত দিনে অনেক নাটক করে ফেলেছিলাম। ‘চাকা’ নাটকটি আমাকে উৎসর্গ করেছিলেন, বইয়ের উৎসর্গপত্রে আমাকে ‘মঞ্চকুসুম’ বলেছিলেন।

মঞ্চে আপনার সেরা নাটক কোনগুলো? বিনোদিনী নিশ্চয়ই এগিয়ে থাকবে। কারণ এখানে আপনি একক অভিনয় করেছেন?

‘বিনোদিনী’ সেরা অর্জন কি না জানি না। আমার কাছে প্রতিটি চরিত্রই সন্তানের মতো। পারফরম্যান্সের আগে তাকে সময় দিই, বোঝার চেষ্টা করি। সন্তানকে যেভাবে লালনপালন করি, চরিত্রগুলোও সেভাবে করি।

মানে প্রতিটি চরিত্র তৈরির পেছনে সমান শ্রম ও নিষ্ঠা বিনিয়োগ করেন। কিন্তু চরিত্র দাঁড় করানোর পদ্ধতিটি কী?

আমি ঢাকা থিয়েটারে একসঙ্গে অনেক কাজ করি—মিউজিক, স্ক্রিপ্ট এডিটিং, কস্টিউম, কোরিওগ্রাফি ও অভিনয়। চার-পাঁচটি কাজ করতে গিয়ে একটি স্ক্রিপ্ট আমার ঝরঝরে মুখস্থ হয়ে যায়। তখন কাজ করতে খুব সুবিধা হয়। এভাবেই আমি নিজেকে তৈরি করি। চরিত্রের ভেতর ঢোকার আগে নিজেকে তৈরিরও একটা ব্যাপার থাকে। আমি তখন একা থাকি। চরিত্রগুলো তৈরি হয় তখনই।

দর্শকের বেশি প্রশংসা পেয়েছেন কোন নাটকে?

সেদিক দিয়ে তো ‘বিনোদিনী’ অবশ্যই এগিয়ে। তারও আগে সবার ভালো লেগেছে ‘হাতহদাই’। ছোট্ট একটি চরিত্র; কিন্তু ভালো লেগেছে সবার। এরপর ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘বনপাংশুল’, ‘চাকা’র কথাও বলতে হবে।

আর মিউজিক? আপনি তো বেশ কিছু ছবিতে প্লেব্যাকও করেছেন?

সেটা তো করেছি ছোটবেলায়।

গেরিলা, একাত্তরের যীশুতেও তো গেয়েছেন?

ও হ্যাঁ, হ্যাঁ।

আর ‘ঘুড্ডি’, ‘আগামী’?

‘আগামী’তে গাইনি, মিউজিক করেছি।

আমাদের এখানে সাধারণ জনগণ পর্দায় যা দেখে-শোনে, তাকেই পারফর্মিং আর্ট ভাবে। সেদিক ভেবে সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়ার কোনো চেষ্টা করেছিলেন?

আমার চেষ্টাটা ঠিক সেভাবে ছিল না। কারণ আমি মঞ্চে অনেক বেশি সময় দিয়েছি। আর যে চর্চাটা ছিল সেটা দিয়ে নাটক ও ফিল্মে মিউজিক করেছি, করে যাচ্ছি এখনো।

সংগীত-অভিনয়, একটার সঙ্গে আরেকটা তো সম্পর্কযুক্ত...

সংগীত ও অভিনয়কে আলাদা করে দেখি না। সংগীত যদি না জানতাম, তাহলে চরিত্রগুলোকে সেভাবে ডেভেলপ করতে পারতাম না। সংগীতের সঙ্গে আমি চরিত্রগুলোকে মিলিয়ে ফেলি। এটা আমার জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট।

মঞ্চে এখন কী কাজ করছেন?

আপাতত কিছু করছি না। আমার একটি বড় অসুখ গেল মাঝখানে, কোমরের হাড় ক্ষয় হয়েছে। ডাক্তারের অনুমতির অপেক্ষায় আছি। সে কারণেই সাড়ে তিন-চার মাস মঞ্চে উঠিনি।

ঢাকা থিয়েটারে নাটক করে অনেকেই জনপ্রিয় হয়েছেন। কিন্তু ঢাকা থিয়েটার নামটি উচ্চারিত হলে সবার আগে তিনটি নাম মাথায় আসে—সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দীন ইউসুফ এবং আপনি...

কারণ আমরা একনাগাড়ে ৪৩ বছর দলকে সময় দিয়েছি। ঢাকা থিয়েটার ছাড়া নিজের জন্য আর কিছুই করিনি।

কিছুই না?

নিজের জন্য করেছি একটি একুশের গানের সিডি, একটি ডুয়েট সিডি, একটি লালনের গানের সিডি, দেশের গানের অ্যালাবাম ‘মাটির জায়নামাজ’। এই পাঁচটি সিডি কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে করিনি। আর করেছি আলতাফ মাহমুদ ভাইয়ার শেখানো কিছু গান; যেন ভাইয়ার গানগুলো হারিয়ে না যায়।

‘দ্য টেম্পেস্ট’ নিয়ে শেকসপিয়ারের গ্লোব থিয়েটারে প্রথম বাংলায় নাটক করলেন। এটি কি আপনার জীবনের কোনো বিশেষ ঘটনা?

অবশ্যই। কারণ গ্লোবে সাড়ে চার শ বছরের মধ্যে প্রথম বাংলা উচ্চারিত হয়। সেখানে ৩৭টি নাটক হয়েছিল ৩৭ দেশের ভাষায়।

শো শেষে বিদেশি দর্শকদের প্রতিক্রিয়া কী?

‘টেম্পেস্ট’ যে মঞ্চে এ রকমভাবেও প্রেজেন্ট করা যায়, অনেকে ভাবতেই পরেনি। ওরা অভিভূত হয়ে গিয়েছিল। অন্যরা শেকসপিয়ারের নাটক করতে গেছে ওই স্যুট-টাই-কোট-গাউন পরে। আমাদের কস্টিউমটাই অন্য রকম। আমরা করেছি মণিপুরি ফর্মে। গান, নাচ—সবই আছে। শোর পর ১০ মিনিট আমাদের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি দর্শক, ওরাও আমাদের সঙ্গে নেচেছে।

স্বাধীনতার পর যে আবেগ নিয়ে আপনারা থিয়েটার শুরু করেছিলেন, সেই আবেগ কি এখনো আছে? শুধু ঢাকা থিয়েটার না, সামগ্রিক থিয়েটারের কথা বলছি।

সেই আবেগ নেই। এখন থিয়েটারকে পেশাদার দৃষ্টিতে দেখা হয় ঠিকই, কিন্তু আসলে কেউ পেশাদার না। সময়মতো রিহার্সালে আসা, স্ক্রিপ্ট পড়া—এগুলো কমে গেছে।

এমনটা কেন হচ্ছে?

আমাদের সমাজব্যবস্থা অনেক বদলে গেছে। আমরা যখন শুরু করেছিলাম তখন ধর্মান্ধতা ছিল না। এখন সবাই পড়াশোনা ও কাজের ফাঁকে মঞ্চ করে। ওদের তো আমরা একটি টাকাও দিতে পারি না। যদি যাওয়া-আসার টাকাটা অন্তত দিতে পারতাম, তবু বলতে পারতাম তোমরা সময়মতো আসো। সরকারের কাছেও থিয়েটারকর্মীরা একেবারেই উচ্ছিষ্ট।

মঞ্চের দর্শকও তো কমে গেছে...

অনেক। ওই যে বললাম আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং ধর্মান্ধতা। এসবের কারণেই মঞ্চনাটকের প্রতি মানুষের আগ্রহ কম। জি বাংলা, স্টার জলসাও কিন্তু মঞ্চের দর্শক কমিয়ে দিয়েছে। দর্শক ধরে রাখার ব্যাপারে আমাদের চেষ্টাও বোধ হয় কম ছিল। নইলে এ রকম হবে কেন?

বিনোদনের অনেক মাধ্যম তৈরি হওয়াটাও বোধ হয় একটি কারণ?

অবশ্যই। ঘরে বসে যদি বিনোদন পাই, তাহলে আর বাইরে বের হব কেন?

তাহলে উপায় কী?

আমাদের লেখাপড়া কমে গেছে। ইংরেজি সাহিত্য পড়তেই হবে এমন কোনো কথা নেই। বাংলা সাহিত্যও বা কতটুকু পড়ছি এখন? অথচ আমরা যখন ক্লাস এইটে তখনই রবীন্দ্রনাথ পড়া শুরু করেছিলাম। বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কমলকুমারও তত দিনে পড়া শেষ। এসব না পড়লে তো মনন তৈরি হবে না।

আগামীর পরিকল্পনা কী আপনার? জীবনের কাছে আর কী চান?

জীবনের কাছে আর কিছুই চাওয়ার নেই। যত দিন পারি কাজ করে যাব। এটা পেতে হবে, ওটা পেতে হবে—এমন ভাবনা আমার কখনো ছিল না, এখনো নেই।


মন্তব্য