kalerkantho

আলোর মধ্যে কালো

আদিল উদ্দিন আহমেদ, ভৈরব (কিশোরগঞ্জ)   

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০



আলোর মধ্যে কালো

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের সাফল্য ও নতুন সংযোগে সারা দেশে ‘আলোর ফেরিওয়ালা’ কর্মসূচি এরই মধ্যে সুনাম কুড়িয়েছে। এসব সাফল্য থেকে বঞ্চিত কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলাবাসী। এই উপজেলার শিমুলকান্দি বিদ্যুৎ অফিসের সহকারী প্রকৌশলী মফিজ উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে তদন্ত চলছে।

প্রায় আট হাজার আবাসিক ও দুই শতাধিক সেচ পাম্প ব্যবহাকারী গ্রাহক এই বিদ্যুৎ অফিসের আওতাভুক্ত। গ্রাহকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, মফিজ উদ্দিন শিমুলকান্দি বিদ্যুৎ অফিসে যোগদানের পর এলাকায় একটি দালালচক্র গড়ে তোলেন। চক্রের মাধ্যমে এলাকায় ফ্যাক্টরি বা কোনো মিল-কারখানায় নতুন সংযোগ নিতে চাইলে মোটা অঙ্কের ঘুষ বাণিজ্য করেন। অন্যদিকে দাবি করা টাকা না দিলে টালবাহানায় সংযোগের নামে মাসের পর মাস গ্রাহকদের হয়রানি করা হয়। এ ছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন ও খুঁটি মেরামত, ঝুলে থাকা সড়কের গাছ ও ডালপালা পরিষ্কার না করে প্রতি মাসে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করেন। শুধু তা-ই নয়, মেরামত বাবদ বিদ্যুতের সরকারি সরঞ্জামাদি তিনি গ্রাহকের কাছে বিক্রি করেন।

গ্রাহকদের অভিযোগে আরো জানা যায়, এলাকাবাসীর কাছ থেকে সাত লাখ টাকা নিয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমোদনবিহীন ট্রান্সফরমারসহ শ্রীনগর পূর্বপাড়ার মুকুল মাস্টারের বাড়ি থেকে রেহান মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত ১৭টি খুঁটি বসিয়েছেন মফিজ। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে সেচ পাম্পে মিটার ছাড়াই বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। মিটারের জন্য তাগাদা দিলেও তা না দিয়ে গড় বিল করে মোটা অঙ্কের টাকা কামাচ্ছেন এই অসাধু কর্মকর্তা।

শ্রীনগর ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য জাহের মিয়া বলেন, ‘বধূনগর গ্রামের তারা মেম্বারের বাড়ি হইতে ইসলামপুর পর্যন্ত ৩০টি খুঁটি বসানোর জন্য মফিজ উদ্দিন তিন লাখ টাকা চান। অথচ স্থানীয় সংসদ সদস্য নাজমুল হাসান পাপন এলাকাবাসীর আবেদনের পক্ষে স্বাক্ষর করে প্রকৌশলীকে কাজ করার জন্য নির্দেশ দিলেও অধ্যাবধি প্রকল্প সম্পন্ন হয়নি।’

শ্রীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সার্জেন্ট (অব.) তাহের মিয়া জানান, মফিজ উদ্দিন ২০০৯ সালে শিমুলকান্দি বিদ্যুৎ অফিসে যোগ দেন। বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগে একাধিকবার এখান থেকে বদলি হন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে প্রায় এক যুগ ধরে একই স্থানে বহাল।

ভবানিপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল হান্নান বলেন, ‘বিদ্যালয়ের নামে ব্যবহৃত ৩০ ইউনিট বিদ্যুতের পরিমাণ দেখালেও প্রতি মাসে বিল আসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। একটি বিদ্যালয়ের বিল যদি অবহেলার চোখে দেখা হয়, তাহলে অন্য গ্রাহকদের অবস্থা কী হবে?’

একটি সূত্র জানায়, অভিযুক্ত মফিজ উদ্দিনের বাড়ি ময়মনসিংহের গফুরগাঁও উপজেলায়। তবে তিনি সপরিবারে ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ায় রাজধানীর উত্তরায় বসবাস করেন। ব্যয়বহুল এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই সন্তানকে পড়ালেখা করাচ্ছেন তিনি। এদিকে কিশোরগঞ্জ শহরের নগুয়ায় একটি বিদ্যালয়ের পাশে একটি ছয়তলা ভবন নির্মাণ করছেন। সরকারি চাকরির বেতনে এই ভবন নির্মাণ সম্ভব কি না, এই প্রশ্ন এলাকাবাসীর।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, গত বছরের নভেম্বরে ঢাকার তদন্ত ও শৃঙ্খলা পরিদপ্তর বরাবর স্থানীয় ভুক্তভোগী গ্রাহকরা একটি লিখিত অভিযোগ দেয়। এতে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের আগস্টের বিদ্যুৎ বিলে সব গ্রাহককে অতিরিক্ত ইউনিট যোগ করা হয়েছে। পরে গ্রাহকরা এ বিষয়ে অফিসে জানতে গেলে মিজান ও লাইনম্যান হিমেল জানান, আশুগঞ্জ থেকে যে বৈদ্যুতিক লাইন ভৈরব আসে, সেই লাইনের লস কমানোর জন্য এক কর্মকর্তার নির্দেশে অতিরিক্ত ইউনিট যোগ করা হয়েছে। তবে এই লিখিত অভিযোগ কোনো কাজে আসেনি। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রচারিত হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। ভৈরব বিদ্যুৎ অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ময়মনসিংহের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মো. শাকিব হোসেন ও কিশোরগঞ্জের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মেহেদী হাসান সুমন। কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করার পর তিন সপ্তাহ পার হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এদিকে প্রতিকার না পেয়ে মফিজ উদ্দিনের অপসারণের দাবিতে সম্প্রতি শতাধিক গ্রাহক বধূনগর-জাফরনগর সড়কে ঘণ্টাব্যাপী অবরোধ করে। তারা ঝাড়ু মিছিল ও মানববন্ধন করে। এর আগে তেয়ারীর চর বাজারে মফিজ উদ্দিন খানের অপসারণের দাবিতে কয়েক শ গ্রাহক বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করে।

গ্রাহকদের এত সব অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার অফিসে গিয়েও সাক্ষাৎ মেলেনি অভিযুক্ত মফিজ উদ্দিন খানের। তার পরও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইশরাত সাদমিন বলেন, ‘কেউ আমার কাছে অভিযোগ করেনি। আমার কাছে অভিযোগ করলে ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেব।’

তদন্ত কমিটির সদস্য জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মো. সাকিব হোসেন ভৈরব নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকাবাসীর অভিযোগের কিছুটা সত্যতা পাওয়া গেছে। আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’

 



মন্তব্য