kalerkantho

ভুট্টা ছেড়ে বিষ চাষ!

অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল   

১৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভুট্টা ছেড়ে বিষ চাষ!

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার জোকারচরে চাষ হচ্ছে তামাক। ছবি : কালের কণ্ঠ

টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় অবাধে বিষপাতা তথা তামাক পাতার আবাদ হচ্ছে। এসব জমিতে আগে ভুট্টা চাষ হতো। সিগারেট উৎপাদক কম্পানিগুলোর প্রলোভনে পড়ে কৃষকরা তামাক চাষে ঝুঁকছে। অথচ তামাক চাষ করতে গিয়ে জমির উর্বরা শক্তি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষক ও তার পরিবারের সদস্যরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে।

টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার গোপালপুর, ভূঞাপুর, কালিহাতী, টাঙ্গাইল সদর, দেলদুয়ার ও নাগরপুর উপজেলায় ব্যাপক হারে তামাকের চাষ হচ্ছে। যমুনা, ধলেশ্বরী নদীর তীর ঘেঁষা এসব চরাঞ্চলে বর্ষাকালে পলি পড়ে। উর্বর এসব জমিতে আগে মসুর, মাষকলাই, ভুট্টা, বাদাম, কাউন, গম, আলু, আখের চাষ হতো। কিন্তু অনেক জায়গায় কয়েক বছর ধরে তামাকের চাষ হচ্ছে। বহুজাতিক ও দেশীয় টোব্যাকো কম্পানিগুলোর প্রলোভনে পড়ে কৃষকরা এই ‘বিষপাতা’ চাষে আগ্রহী হচ্ছে। কয়েকটি বিড়ি, সিগারেট ও জর্দা কম্পানি তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকদের তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করছে। তারা কৃষকদের অধিক মুনাফার পাশাপাশি সার, বীজ ও সেচের জন্য নগদ টাকা মূলধন (ঋণ) হিসেবে দিচ্ছে। নানা সুযোগ-সুবিধা পাওয়ায় কৃষকরাও তামাক চাষে ঝুঁকছে।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর, কালিহাতী, ঘাটাইল, গোপালপুর ও সদরের বিভিন্ন এলাকায় তামাকের চাষ হচ্ছে। এসব এলাকার কৃষকরা জানায়, তামাক চাষে প্রতি শতাংশ জমি বাবদ পাঁচ কেজি সার ও প্রয়োজনমতো তামাক বীজ সরবরাহ করছে টোব্যাকো কম্পানিগুলো।

এ থেকে শতাংশপ্রতি প্রায় এক হাজার টাকার তামাক উৎপাদন করা যায়। কম পরিশ্রমে অধিক লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।

কালিহাতী উপজেলার তামাক চাষি মো. সোনা মিয়া জানান, তিনি এ বছর ১৫ একর জমিতে তামাক চাষ করেছেন। প্রতি একরে তামাক চাষে খরচ হয়েছে প্রায় এক হাজার টাকা। এ তামাক বিক্রি করে লাভ হবে প্রতি একরে এক থেকে দেড় হাজার টাকা। তামাক চাষ করলে শুধু শরীরে খাটতে হয়, পুঁজি লাগে না। তামাক শুকিয়ে কম্পানিকে বুঝিয়ে দিলেই লাভ ঘরে চলে আসে। তিনি জানান, এই জমিতে কলাই, বাদাম ইত্যাদি চাষ করলে মূলধন ছাড়াও বাড়তি শ্রমিক লাগে। খরচ শেষে বিক্রি করে তামাকের চেয়ে অর্ধেকের কম লাভ হয়। তাই তিনি তামাক চাষ করছেন। নাগরপুর উপজেলার মফিদুল, রূপচান, আজিজুল, টাঙ্গাইল সদরের আজগর আলী, রশিদ মিয়া, আন্তাজ আলীর বক্তব্যও একই রকম। তাঁরা জানান, জমি ও শরীরের ক্ষতি হলেও অধিক লাভের জন্যই তাঁরা তামাক চাষ করছেন।

তবে কেউ কেউ অভিযোগ করেন, কম্পানিগুলো তামাক চাষ বৃদ্ধিতে বীজ ও সার সরবরাহ করলেও স্বাস্থ্যহানি রোধে অ্যাপ্রোন বা মাস্ক সরবরাহ করছে না।

টাঙ্গাইলের কৃষিবিষয়ক লেখক কৃষিবিদ ফরহাদ আহম্মেদ বলেন, তামাকগাছ জমি থেকে বেশি পরিমাণ পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে। এতে মাটি দ্রুত উর্বররা শক্তি হারায়। পরবর্তী সময়ে ওই জমিতে অন্য ফসল আবাদ করতে বেশি সার দিতে হয়। তামাকে নিকোটিন থাকায় এটি চাষে শারীরিকভাবেও কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. শরীফ হোসেন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, তামাক চাষ, তামাক পাতা শুকানো থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত করার সঙ্গে যুক্ত থাকলে বিভিন্ন চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি শ্বাসকষ্টও হতে পারে। এমনকি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক আবু আদনান বলেন, তামাক চাষিদের ভুট্টা চাষে অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে। ভূঞাপুর উপজেলার চরাঞ্চলে তামাক চাষ বন্ধে মাইকিংও করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সরকারি কোনো বিধিনিষেধ না থাকায় তামাক চাষের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া যাচ্ছে না। তবে এ ব্যাপারে কৃষকদের নিরুৎসাহী করা হচ্ছে। আগের চেয়ে তামাক চাষ কমে আসছে। এ বছর টাঙ্গাইল জেলায় ২৩৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে বলে তিনি জানান।

মন্তব্য