kalerkantho

পাঠক জেগে আছে

মানিক আকবর, চুয়াডাঙ্গা   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



পাঠক জেগে আছে

চুয়াডাঙ্গা সরকারি গণগ্রন্থাগারে পাঠকের একাংশ ছবি : কালের কণ্ঠ

সকাল ১০টা বাজলে খুলে যায় দরজা। পাঠকরা আসে। পছন্দের আসন বেছে নিয়ে পড়তে বসে। কেউ সংবাদপত্র, কেউ বা থরে থরে সাজানো বইয়ের তাক থেকে বই নিয়ে খুলে বসে। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে এই পাঠ। চুয়াডাঙ্গা জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারের নিত্যদিনের দৃশ্য এটি।

দেশের প্রথম সারির সব বাংলা ও ইংরাজি দৈনিক সংবাদপত্র, দেশি-বিদেশি ম্যাগাজিন এবং বেশ কিছু বিষয়ভিত্তিক পত্রিকা নিয়মিত রাখা হয়। পাঠাগারটি রবিউল ইসলাম সড়কে অবস্থিত। শহরের মাঝামাঝি স্থানে হওয়ায় সব এলাকার পাঠকের জন্য এখানে আসা বেশ সহজ। এর চারদিক প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই পাঠক তার মোটরসাইকেল কিংবা বাইসাইকেল রাখতে পারে নির্দিষ্ট স্থানে। এ জন্য কোনো খরচ দিতে হয় না। স্থানটিও সুরক্ষিত। স্ট্যান্ডে লোহার রডের সঙ্গে যানবাহনের তালা লাগিয়ে রাখার ব্যবস্থা আছে। এতে গাড়ি চুরি হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে না। পাঠকক্ষে আছে নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা। আছে ভালো মানের শৌচাগার। পাঠক ইচ্ছা করলে প্রতিদিন ওজন মেপে দেখে নিতে পারে। বিভিন্ন শ্রেণির পাঠকদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা রয়েছে। শিশুদের জন্য শিশু কর্নার, নারীদের জন্য আছে নারী কর্নার।

পাঠাগার সূত্র জানায়, আশির দশকে চুয়াডাঙ্গায় এই পাঠাগারের যাত্রা। তখন একই সড়কের রূপছায়া সিনেমা হলের পাশের অ্যাসোসিয়েশন হলে ছিল পাঠাগারের কার্যক্রম। অ্যাসোসিয়েশন হলটি ছিল বেশ পুরনো আমলের। ছাদ দিয়ে পানি পড়ত। সে সময় অনেক বই-পুস্তক বৃষ্টির পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে। ২০১২ সালে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর শহরের একই সড়কের ঈদগাহপাড়ায় ২৬ শতাংশ জমির ওপর সরকারি গণগ্রন্থাগারের জন্য এই ভবন নির্মাণ করে।  সপ্তাহে পাঁচ দিন শনিবার থেকে বুধবার খোলা থাকে। এই সময়ের মধ্যে যে কেউ যতক্ষণ খুশি পাঠকক্ষে থেকে পড়তে পারে। পাঠকক্ষটি প্রধান সড়ক থেকে একটু দূরে হওয়ায় বাইরের তেমন কোনো শব্দ এখানে আসে না। এ কারণে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করে। পাঠকরা নীরবে বই পড়ার সুযোগ পায়।

পাঠাগারের সদস্য হতে পারে যে কেউ। বইয়ের মূল্য জমা রেখে একজন পাঠক ইচ্ছা করলে বই বাড়িতে নিয়ে যেতে পারে। পড়ার পর ফেরত দিয়ে আবারও আরেকটি বই নিতে পারে। এই সেবাও দেওয়া হয় বিনা খরচে। বই পড়া হয়ে গেলে পাঠক বই ফেরত দিয়ে তার জমা দেওয়া টাকা ফেরত নিতে পারে।

পাঠাগারে রয়েছে ৩৫ হাজারের বেশি বই। আছে বঙ্গবন্ধু কর্নার এবং জব কর্নার। বঙ্গবন্ধু কর্নারে আছে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই।

এত সব সুযোগ-সুবিধা থাকার কারণে পাঠকের সংখ্যাও অনেক। প্রতিদিন গড়ে ৩০০ পাঠক এখানে আসে। পুরনো পত্রিকা দেখার প্রয়োজন হলে পাঠকরা সে সুযোগও পেয়ে থাকে। দেশের প্রায় সব শীর্ষ দৈনিক পত্রিকা এখানে সংরক্ষণ করা হয়। অনেকে পুরনো পত্রিকা খুঁজে পেতেও আসে।’

চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পাঠাগারে পর্যাপ্ত বই আছে। বসে পড়ার ভালো ব্যবস্থাও আছে। এত সুযোগ থাকার পর যেসংখ্যক মানুষের পাঠাগারমুখী হওয়ার কথা, তা হয় না বলে আমি মনে করি।’

চুয়াডাঙ্গার কবি-ছড়াকার ইদ্রিস মণ্ডল বলেন, ‘পাঠাগারটিতে যত সুযোগ-সুবিধা আছে সেই তুলনায় এখানে পাঠক কম। আরো বেশি পাঠক হওয়া উচিত ছিল। পাঠকের পাঠসংশ্লিষ্ট যেকোনো চাহিদা তাঁরা পূরণ করার চেষ্টা করেন।’

কলেজছাত্র রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, ‘এই পাঠাগারে ভারতের দেশ, সানন্দা নিয়মিত রাখা হয়। পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী দেশের সব শীর্ষ শ্রেণির পত্রিকা এখানে থাকে। অনেকে আছেন যাঁরা দিনে কাজে ব্যস্ত থাকেন। তাঁদের জন্য রাত ১০টা পর্যন্ত পাঠকক্ষ খোলা রাখলে পাঠক আরো বাড়বে।’

চুয়াডাঙ্গা সরকারি গণগ্রন্থাগারের কনিষ্ঠ গ্রন্থাগারিক মো. জিয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক পাঠক তাঁদের প্রয়োজনীয় বিষয় সংবাদপত্র থেকে ফটোকপি করে নিতে চান, এ সুযোগ এখানে আছে। পাঠকের চাহিদা বিবেচনা করা হয়। পাঠক পুরনো পত্রিকা পড়ার সুযোগ পান। সব সেবা দেওয়া হয় বিনা খরচে। এ ছাড়া গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিবছর এখানে বিশেষ বিশেষ দিবস উপলক্ষে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়ে থাকে।’



মন্তব্য