kalerkantho


কোটালীপাড়া

স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও গড়ে ওঠেনি পাঠাগার

সুশিক্ষিত মানুষ তৈরির জন্য সরকারি পাঠাগার সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে

মিজানুর রহমান বুলু, কোটালীপাড়া (গোপালগঞ্জ)   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও গড়ে ওঠেনি পাঠাগার

প্রাচীন বঙ্গের শিক্ষা-সংস্কৃতির পীঠস্থান ছিল কোটালীপাড়া। ষষ্ঠ থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে গুপ্ত আমলে কোটালীপাড়ায় বঙ্গ রাজ্যের রাজধানী ছিল। প্রাচীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা ‘টোল’র কারণে পণ্ডিতদের আবাসভূমি হিসেবে ভারতজুড়ে এর খ্যাতি ছিল। বিক্রমপুরের অতীশ দীপঙ্করের পরে আন্তর্জাতিকভাবে প্রাচীন বাংলার পণ্ডিত হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন মধুসূদন সরস্বতী। তিনি ছিলেন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার মানুষ। কালের বিবর্তনে সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি কোনো এক সময় প্রবল ভূমিকম্পে এখানকার ভৌগোলিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এতে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো বিলুপ্ত হওয়ার পাশাপাশি কোটালীপাড়ার সমৃদ্ধ ইতিহাস চাপা পড়ে যায়।

তবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই বিপর্যয় থেকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় এ অঞ্চলের মানুষ। ১৮৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন। এর মাধ্যমে জ্ঞানচর্চা কিছুটা গতি পায়। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের কারণে অনেক হিন্দু পণ্ডিত পশ্চিমবঙ্গমুখী হয়। দেশভাগের পরে কোটালীপাড়া শিক্ষা-সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশির ভাগ মানুষ ভারতে চলে যায়। ফলে আবার একটি সংকট দেখা দেয়। প্রাচীন শিক্ষা ব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় টোলমুখী শিক্ষা ব্যবস্থায় ছেদ পড়ে। এরপর সময়ের প্রয়োজনে মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিকে ঝুঁকলেও আগের মতো পাঠাগারমুখী হওয়ার প্রবণতা কমে যায়। মানুষ গভীর জ্ঞানমুখী হওয়ার চেয়ে সনদসর্বস্ব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষামুখী হয়ে পড়ে।

এরপর দেশ স্বাধীনের ৪৮ বছরেও কোটালীপাড়ায় সরকারিভাবে কোনো পাঠাগার নির্মিত হয়নি। তবে জেলা পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত কবি সুকান্ত লাইব্রেরিসহ এ উপজেলায় ১২টি গ্রন্থাগার রয়েছে। কিন্তু এসব গ্রন্থাগারে সব শ্রেণির পাঠকদের চাহিদামতো বই নেই।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত শিশুসাহিত্যিক খালেক বিন জয়েন উদ্দীন বলেন, ‘কোটালীপাড়া ছিল বঙ্গের প্রাচীন জনপদ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একসময় কোটালীপাড়া ছিল গুপ্তদের রাজধানী। এখানে অনেক পণ্ডিতের বসবাস ছিল। সময়ের বিবর্তনে বঙ্গভঙ্গ আর ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর হিন্দু পণ্ডিতরা ভারতে চলে যাওয়ায় সব দিক থেকে একটা শূন্যতা তৈরি হয়। এরপর দীর্ঘদিন এ এলাকা অবহেলিত ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্প্রতি যোগাযোগ ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেড়েছে। কিন্তু এখন জ্ঞানমুখী মানুষ তৈরির জন্য বড় ধরনের পাঠাগার সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

কোটালীপাড়া শেখ লুৎফর রহমান আদর্শ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক গৌরাঙ্গ লাল চৌধুরী বলেন, ‘এখন আমরা যারা আছি তারা জ্ঞান অন্বেষণের চেয়ে অর্থ অন্বেষণের দিকে বেশি ঝুঁকছি। ফলে পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি না।’ সাংবাদিক প্রশান্ত অধিকারী বলেন, ‘এখনকার শিক্ষাব্যবস্থা হচ্ছে সংস্কৃতিবিহীন সনদসর্বস্ব। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যম্ভাবী। এ জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবেই উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।’ উপজেলার তারাশী গ্রামে নির্মিত ‘জ্ঞানের আলো’ পাঠাগারের সভাপতি সুশান্ত মণ্ডল বলেন, ‘তিন বছর আগে এলাকার কিছু মুক্তচিন্তার যুবকদের নিয়ে পাঠাগারটি নির্মাণ করি। কিন্তু অর্থাভাবে এখন পর্যন্ত সব শ্রেণির পাঠকদের চাহিদামতো বই সংগ্রহ করতে পারিনি।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের উপজেলা পরিষদের পুরনো ভবনের একটি লাইব্রেরি ছিল। কিন্তু ভবনটি ভেঙে নতুন ভবন করা হলে এটি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা শিগগিরই নতুন ভবনে একটি আধুনিক লাইব্রেরি গড়ে তুলব। সেখানে সব শ্রেণির পাঠকদের কথা চিন্তা করে বই রাখা হবে।’



মন্তব্য