kalerkantho


নদ-নদীর ভাঙন

কুষ্টিয়ায় ২০০ কোটি টাকার বাঁধে ধস

নতুন করে হুমকির মুখে রবীন্দ্র কুঠিবাড়িসহ দুটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনপদ

তারিকুল হক তারিক, কুষ্টিয়া   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



কুষ্টিয়ায় ২০০ কোটি টাকার বাঁধে ধস

কুষ্টিয়ায় রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি (ইনসেটে) রক্ষা প্রকল্পে দুই মাস আগে এই বাঁধ নির্মাণ শেষ হয়। সম্প্রতি দেখা দিয়েছে ধস। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুই মাস আগে নির্মাণ শেষ হওয়া কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি রক্ষা প্রকল্পের বাঁধের প্রায় ৪০ মিটার গত সোমবার ধসে গেছে পদ্মা নদীতে। আরসিসি ব্লকসহ এই বাঁধ ধসে পড়ায় নতুন করে লোকালয় ভাঙছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন জিও ব্যাগে বালু ভরে ভাঙনকবলিত স্থানে ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে। তবে বাঁধের আরো বড় অংশ ধসে যাওয়ার আশঙ্কা করছে এলাকার মানুষ।

এলাকাবাসী জানিয়েছে, সোমবার সকালে হঠাৎ বাঁধের প্রায় ৪০ মিটার পদ্মা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি রক্ষায় সরকার ১৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ঠিকাদারের মাধ্যমে এ বাঁধের নির্মাণকাজ করে। নির্মাণকাজ শেষে ভাঙন শুরু হওয়ায় এলাকার মানুষের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কাজে অনিয়ম হয়েছে অভিযোগ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও পাউবোকে তারা দোষারোপ করেছে। তাদের অভিযোগ, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারসহ ব্যাপক দুর্নীতির কারণে মাত্র দুই মাস আগে নির্মিত বাঁধে এভাবে ভাঙন দেখা দিয়েছে। শিডিউল মোতাবেক কাজ হয়নি। যে পরিমাণ আরসিসি ব্লক ও জিও ব্যাগ ফেলার কথা তা ফেলা হয়নি।

গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কয়া ইউনিয়নের কালোয়া গ্রামের দক্ষিণ পাশে পদ্মা নদী ঘেঁষে নির্মিত বাঁধের বড় একটি অংশ ভেঙে নদীতে চলে গেছে। এখন ব্লক খসে খসে পড়ছে। খবর পেয়ে শত শত গ্রামবাসী নদীর পারে ভিড় জমিয়েছে। শিলাইদহ, কয়া ইউনিয়নসহ নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পাউবো ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন জিও ব্যাগভর্তি বালু ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে। গ্রামবাসী জানায়, সকালে নদীর পানিতে ঘূর্ণির মতো কিছু একটা শুরু হয়ে লাল রঙের ভুবড়ি (ভুড়ভুড়ি) ওঠা শুরু হয় এবং এর পরপরই বাঁধের বড় একটি অংশের ব্লক নদীতে তলিয়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী জানায়, এখানে কাজে ফাঁকি দিয়ে ঠিকাদারের লোকজন ও পাউবোর কর্মকর্তারা কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছে। কাজ সঠিকভাবে হলে পানি ঢুকে ব্লক ধসে পড়ত না। আগেই কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, এখন সেটা সত্য প্রমাণিত হলো। বাঁধ নির্মাণ শেষ হওয়ার পর সবার মধ্যে স্বস্তি ছিল। এখন আবার ভয় কাজ করছে। সঠিক তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাদের।

পাউবো সূত্র জানায়, ২০১৫ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ কুঠিবাড়ির অদূরে পদ্মায় তীব্র ভাঙন শুরু হলে পাউবো নদীতীর সংরক্ষণে প্রকল্প গ্রহণ করে। ২০১৬ সালে পাউবো কুঠিবাড়ি ও আশপাশের জনপদ রক্ষায় ১৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নদীতীর সংরক্ষণের কাজ শুরু করে। শিলাইদহ এলাকায় পদ্মার ডান তীর এলাকায় প্রায় তিন হাজার ৭২০ মিটার দীর্ঘ এ বাঁধ নির্মাণকাজ ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেড বাস্তবায়ন করে। দুই মাস আগে নির্মাণকাজ শেষ হয়। এতে আশার আলো দেখে স্থানীয় রবীন্দ্রপ্রেমী ও সাধারণ মানুষ। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের গাফিলতিতে সে আশা-ভরসা ফিকে হতে শুরু করেছে।

শিলাইদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন তারেক জানান, এই বাঁধ রক্ষা করা না গেলে ঐতিহ্যবাহী রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি রক্ষা করা যাবে না। এলাকার মানুষের হাজার হাজার বাড়ি-ঘর ও আবাদি জমিও নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। কয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াউল ইসলাম স্বপন বলেন, ‘কাজে অনেক অনিয়ম হয়েছে। যে স্থান থেকে ব্লক সরে গেছে, সেখানে নিচে পরিমাণমতো ব্লক ও জিও ব্যাগ দেওয়া হয়নি। তাই পানি বাড়ার পর ব্লক বসে গেছে। অনিয়ম ও নির্মাণ ত্রুটির কারণেই এমনটা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।’

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প সমন্বয়কারী মোফাজ্জেল হক বলেন, ‘ভয়ের কিছু নেই, ভাঙন শুরু হওয়ার পর আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছি। আপাতত জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ করার চেষ্টা করছি। পানি কমলে বাঁধ পুনরায় মেরামত করে দেওয়া হবে।’

পাউবো কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান জানান, বাঁধ নির্মাণে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি। এ ধরনের বাঁধে ভাঙন দেখা দিতেই পারে। বাঁধ রক্ষায় এরই মধ্যে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।



মন্তব্য