kalerkantho


বিনা মূল্যের মাটি বিক্রি

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বিনা মূল্যের মাটি বিক্রি

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বৌলাই নদী খননের মাটি টাকার বিনিময়ে স্থানীয় লোকজনকে দেওয়া হচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ভারত সীমান্তের বৌলাই নদী খননের মাটি টাকার বিনিময়ে স্থানীয়দের দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে খনন কম্পানি, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ), স্থানীয় প্রশাসন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাসহ একটি চক্র মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

বিআইডাব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, বৌলাই ও রক্তি নদীর ৪০ কিলোমিটার খননের জন্য সরকার ৪৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। তাহিরপুর থানার সামনের সেতু থেকে আনোয়ারপুর সেতু পর্যন্ত প্রায় আট কিলোমিটার খননকাজ শুরু হয়েছে তিন মাস আগে। খননকাজ বাস্তবায়ন করছে অটিবিএল নামের একটি কম্পানি। তাহিরপুরের লাউড়েরগড় থেকে জামালগঞ্জের দুর্লভপুর পর্যন্ত প্রায় ৩২ কিলোমিটার খননের কথা রয়েছে প্রাক্কলনে। তবে বরাদ্দের কারণে দুর্লভপুরের বদলে বিশ্বম্ভরপুরের ফতেপুর সেতু পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার খনন করবে কম্পানিটি। গত শুক্রবার পর্যন্ত বৌলাই নদীর প্রায় ২ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার খনন হয়েছে। রক্তি নদীতেও আনোয়ারপুর থেকে খননকাজ শুরু হয়েছে সম্প্রতি। তবে কোন পদ্ধতিতে খনন হচ্ছে, তা জানে না এই অঞ্চলের বিশেষজ্ঞসহ কৃষকরা।

একই সূত্র জানায়, বৌলাই নদীটি প্রাক্কলনে ১০০ ফুট প্রস্থে খননের কথা ছিল। কিন্তু নদীটি সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ায় ৮০ ফুট প্রস্থ ও পানির স্তর সাপেক্ষে ২২-২৪ ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করা হচ্ছে। বর্তমানে ১ দশমিক ৪৮ ফুট পরমেশন লেভেলসহ আরো দিড় ফুট বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ২২-২৪ ফুট গভীরতা পর্যন্ত খনন করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে অটিবিএল। ২০১৯ সালেই দুটি নদী খনন হওয়ার কথা।

এদিকে স্থানীয়রা বলছে, প্রকৃতপক্ষে প্রাক্কলন অনুযায়ী খনন হচ্ছে কি না, তা বিশেষজ্ঞ ছাড়া কেউ বলতে পারবে না। অন্যদিকে খনন শুরুর পরই মাটি বেচছে একটি চক্র। চক্রটি স্থানীয় সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা, থানা-পুলিশসহ নানা লোকজনের সুপাারিশ নিয়ে খননের মাটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জায়গায় ফেলছে। ফরমে বিনা মূল্যে লেখা থাকলেও প্রতি শতাংশ জমিতে এক হাজার টাকা করে নিচ্ছে।

সরেজমিনে আনোয়ারপুর থেকে তাহিরপুর পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশের সব পতিত পরিত্যক্ত বোরো জমি ভরাট করে মূল্যবান করে তোলার দৃশ্য দেখা গেছে। তাহিরপুর থানার সম্মুখ থেকে রায়পাড়া, উজান তাহিরপুর, ধুতমা এলাকার শনি হাওর ও সূর্যেরগাঁও এলাকার মাটিয়ান হাওরের অনেক স্থানে ফসলি জমি ভরাট করা হয়েছে। যে জমির দাম ছিল অল্প, তা ভরাটের ফলে এখন চার গুণ বেড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, খননকারী প্রতিষ্ঠান অটিবিএলের স্থানীয় সুপারভাইজার রাজু আহমদ ও বিআইডাব্লিউটিএর কারিগরি সহায়তাকারী জুয়েল রানা টাকা লেনদেনে জড়িত। স্থানীয় চক্রকে ভাগ দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এই দুজন। তাঁদের পরামর্শে স্থানীয় দালালরা বিনা মূল্যে মাটি ভরাটসংক্রান্ত একটি আবেদনে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশ এনে দিচ্ছে। উপজেলা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কিছু সুবিধাবাদী নেতা এই চক্রে যুক্ত।

উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে খননের পর আরো কোটি কোটি টাকার মাটি পাওয়া যাচ্ছে বিনা মূল্যে। সেই মাটি বিক্রি করছে একটি সিন্ডিকেট। অথচ প্রাক্কলনে খননের মাটি বিক্রির বিষয়টি থাকলে সরকার মোটা অঙ্কের টাকা পেত।’

তাহিরপুরের ভুক্তভোগী বিপ্লব কান্তি রায় বলেন, ‘আমার জমিতে ড্রেজারের মাটি ফেলা হয়েছে। কিন্তু সেই মাটি আমি টাকা না দেওয়ায় পাশের জমিতে নেওয়া হয়েছে। আমার জমির ক্ষতি করায় আমি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা চিন্তা করছি।’

উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক হাফিজ উদ্দিন পলাশ বলেন, ‘কারা ভরাটের জন্য টাকা-পয়সা নিচ্ছে আমি জানি না। যুবলীগের কেউ জড়িত নয়।’

অটিবিএলের সুপারভাইজার রাজু আহমদ বলেন, ‘মাটি ভরাট থেকে কোনো টাকা-পয়সা নেওয়া হচ্ছে না। আমরা স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশের ভিত্তিতে আবেদনের মাধ্যমে ফ্রি মাটি ভরাট করে দিচ্ছি।’

বিআইডাব্লিউটিএর কারিগরি সহকারি জুয়েল রানা বলেন, ‘আমরা মাটি ভরাটের নামে কারো কাছ থেকে কোনো সুবিধা নিচ্ছি না। বরং স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে মাটি ভরাট করে দিচ্ছি। যাদের সুপারিশ পাচ্ছি তাদের জমিতেই বিনা মূল্যে মাটি ভরাট করছি। কেউ প্রমাণ দেখাতে পারবে না, আমরা টাকা নিচ্ছি।’সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু বকর সিদ্দিক ভূইয়া বলেন, ‘বিআইডাব্লিউটিএ কিভাবে কোন পদ্ধতিতে কাজ করছে, আমরা কিছুই জানি না। তবে খনন যেহেতু হাওরে কৃষির জন্য জরুরি, তাই নজরদারি ও সুষ্ঠু পর্যবেক্ষণ করা দরকার।’

 



মন্তব্য