kalerkantho


খুনের আপসে এমপির হাত

কুমড়ী গ্রামে ৪৫ বছরে ২৮ হত্যা, বিচার হয়নি একটিরও

সাইফুল ইসলাম তুহিন, নড়াইল   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



খুনের আপসে এমপির হাত

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কুমড়ী গ্রামে গত ৪৫ বছরে ২৮ জন খুন হয়েছে। এর কোনোটির বিচার হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো খুনের আপস হয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্যের (এমপি) হস্তক্ষেপে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, হত্যা মামলা আপসযোগ্য নয়।

স্থানীয়রা জানায়, সর্বশেষ গত ১৫ ফেব্রুয়ারি খুন হয়েছেন দিঘলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শেখ লতিফুর রহমান পলাশ। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক। এর আগে কুমড়ী পশ্চিম পাড়ায় আব্দুর রশীদ শেখের ছেলে বনিরুল শেখ (ছাত্র), মোসলেম সিকদারের ছেলে বজলার শিকদার (কৃষক), গোলাম রসুলের ছেলে ছাপা শেখ (ছাত্র), ফজর শেখের ছেলে মিকাঈল শেখ (কৃষক), সৈয়দ সাহেব আলীর ছেলে ইলিয়াস আলী মীর (কৃষক) ও গোলাম রসুলের ছেলে লতিফুর রহমান পলাশ (ইউপি চেয়ারম্যান) খুন হন। কুমড়ী মধ্যপাড়ায় খুন হয়েছেন দুদু খাঁ, দুদু খাঁর ছেলে লায়েক খাঁ, লালমিয়া শেখের ছেলে মুজিবর শেখ, গনি মোল্যার ছেলে কাতেব মোল্যা, রওশন খাঁর ছেলে তোতা খাঁ ও পাচু শেখের ছেলে বাদশাহ শেখ। কুমড়ী পূর্ব পাড়ায় খুন হয়েছেন (পাকিস্তান আমলে) দবির শেখের ছেলে ছবেদ শেখ (ছাত্র) ও মতলেব শেখের ছেলে ঠাণ্ডা শেখ (কৃষক)। পরে খুন হয়েছেন আতিয়ার শেখের স্ত্রী পাচি বিবি, ওজেত শেখের স্ত্রী অলেকা বিবি, ধলা মিয়ার মেয়ে ভিক্ষুক আমেনা (গুঙ্গি), খালেক শেখের ছেলে আফসার শেখ (কৃষক), রোকন শেখের ছেলে কালা শেখ (কৃষক), বাচ্চু শেখের ছেলে তরিকুল শেখ (কৃষক), কাউসার ফকিরের ছেলে তনু ফকির (যুবক), রউফ শেখের ছেলে আজিজুর শেখ (শিশু) ও মুকুল শেখের ছেলে সিয়াম (শিশু)।

উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালে চীনাপন্থী সমাজতান্ত্রিক দল করতেন শেখ হাফিজুর রহমান (এমপি)। সেই সময় কুমড়ী গ্রামের শহীদ মাতবরকে হত্যা করা হয়। এই হত্যার পেছনে শ্রেণিশত্রু খতমের রাজনীতি জড়িত বলে মনে করে স্থানীয়রা। এলাকার একজন নামি লোককে খুনের বদলা নিতে তখন এলাকার ৯ জন মাতবর ও তাদের বংশ মিলে তৈরি করে নাইন গ্রুপ। এর গ্রুপে রয়েছে হাই সরদারের সরদার বংশ, আজি মোল্যা, আকরাম মেম্বার, সোহরাব মেম্বার, লিয়াকত মোল্যা, সামাদ মোল্যা, সৈয়দ বরকত আলী, রবিউল শেখ ও লাকি মোল্যা। এই গ্রুপের শীর্ষ নেতা রবিউল শেখ। অন্যদিকে এমপি হাফিজ শেখের সঙ্গে সাবেক চেয়ারম্যান সালাম শেখ, নিহত চেয়ারম্যান পলাশ শেখের ভাই হিলু শেখ এবং খা বংশের একাংশ নিয়ে হাফিজ গ্রুপ।

গ্রামের লোকজন জানায়, বেশির ভাগ খুনের কারণ প্রতিহিংসা। একটি খুন হলে আধিপত্য বিস্তার করতে আসামি করা হয় প্রতিপক্ষকে। বছরের পর বছর ধরে চলা এসব খুনের ঘটনা এবং পাল্টা হামলা, ভাঙচুর আর লুটপাটের কারণে মামলা হয়েছে প্রায় ৩০টি। আসামি অন্তত তিন হাজার। বছরের পর বছর ধরে চলা গ্রাম্য কোন্দলের কারণে নিঃস্ব হয়েছে অনেকে। অনেকে আবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।

এই গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ওসমান সর্দার বলেন, ‘এই গ্রামে যত খুন হয় কিছুদিন পর তা মিটমাটের জন্য একদল লোক উঠেপড়ে লেগে যায়। এখানকার প্রভাবশালী লোকদের জন্যই কোনো হত্যা মামলার সঠিক বিচার হয়নি। এ কারণে এলাকায় খুন থামছে না।’

দিঘলিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি অহিদুর বলেন, ‘এমপি লোহাগড়ায় বসে কুমড়ী গ্রামের সব হত্যা মামলার মীমাংসা করে থাকেন। এর আগের ১৮টি হত্যা মামলার কোনো বিচার হয়নি।’

স্থানীয়রা অভিযোগ করে, ২০১২ সালে গ্রাম্য কোন্দলের মধ্যে এমপি হাফিজের অনুসারীরা নাইন গ্রুপের বাদশাহ শেখকে হত্যা করে। এ ঘটনার পর প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে অনুসারী তোতা খাঁকে হত্যা করে। এ ঘটনায় এমপির অনুসারী এবং নাইন গ্রুপের নামে মামলা হয়। সম্প্রতি এই দুটি হত্যাকাণ্ড আপসের জন্য এমপি কয়েক দফা বৈঠক করেছেন।

এ সব বিষয়ে লোহাগড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুমড়ী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হাই সরদার বলেন, ‘২০১৪ সালে এমপি হওয়ার পর তিনি (হাফিজ) লোহাগড়া থানায় গিয়ে হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার না করার জন্য বলেছিলেন। আমি তাঁর সেই কথার প্রতিবাদ করেছিলাম। এমপির মতো আরো কিছু লোকের প্রত্যক্ষ মদদে অপরাধের বিচার না হওয়ায় এলাকায় হত্যাকাণ্ড থামছে না। ছোট ছেলেরাও বংশীয় দলাদলিতে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে।’

নাইন গ্রুপের শীর্ষ নেতা রবিউল শেখ বলেন, ‘হাফিজ এমপি হওয়ার চার-পাঁচ মাস পরেই কুমড়ী স্কুল মাঠে দুটি হত্যা মামলার মীমাংসার সালিস বসেন। সালিসে এমপি, সৈয়দ আসাদ আলী, সৈয়দ তোয়াক্কেল আলী, মাসুদ কাজী এবং রব মোল্যাকে বিচারক মানা হয়। বিচারে তোতা খাঁ খুনে ছয় লাখ এবং বাদশাহ শেখ খুনে সাত লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। আমাদের নানা ধরনের অঙ্কে জরিমানা ধরেন। আমরা সেই টাকা দিয়ে দুটি হত্যাকাণ্ড মিটিয়ে ফেলব।’

এ বিষয়ে নড়াইল-২ (লোহাগড়া-সদর আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য ও কুমড়ী গ্রামের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট শেখ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘হত্যা মামলার মীমাংসা তো হতেই পারে। এটা তো আইনে নিষিদ্ধ নেই।’

তবে নড়াইল আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অচীন কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘হত্যাসহ আরো অনেক ধরনের মামলাই আদালতের বাইরে আপসযোগ্য নয়। কিন্তু স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী মাতবররা আদালতের বাইরে আপস করে সাক্ষীর মাধ্যমে মামলা প্রমাণে বাধাগ্রস্ত করেন। এ ক্ষেত্রে আদালতের কিছুই করার থাকে না।’



মন্তব্য