kalerkantho


দেড় কোটি টাকার প্রতারণা

সেনাবাহিনীর নামে ভুয়া নিয়োগপত্র

সাইফুল ইসলাম তুহিন, নড়াইল   

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



দেড় কোটি টাকার প্রতারণা

নড়াইলের কালিয়া উপজেলার কাঠদুরা গ্রামের বাড়িতে নতুন ভবন বানাচ্ছেন রমজান সিকদার (ইনসেটে)। ছবি : কালের কণ্ঠ

সেনাবাহিনীর বেসামরিক (সিভিল) পদে যোগদানের নকল নিয়োগপত্র দিয়ে নড়াইল, গোপালগঞ্জ ও খুলনার ৩০ যুবকের কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। এই টাকা নিয়েছেন কালিয়া উপজেলার নড়াগাতি থানার কাঠাদুরা গ্রামের রমজান সিকদার।

কালিয়া উপজেলার মাউলী গ্রামের যুবক রিপন অধিকারী জানান, গত বছরের ডিসেম্বরে মাউলী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য বাসুদেবের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মালি পদে চাকরির জন্য সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা দেন। ডিসেম্বরে মিরপুর সেনানিবাসের একটি কফিশপে তাঁর হাতে একটি নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি কাজে যোগদানের কথা। যোগদান করতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন নিয়োগপত্র ভুয়া।

একইভাবে এই গ্রামের অনুপ সরকার ও দেবাশীষ পাল সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা করে দিয়ে ভুয়া নিয়োগপত্র পেয়েছেন।

অনুপ সরকার জানান, ডিসেম্বরে মিরপুর সেনানিবাসের একটি খাবারের দোকানে একটি নিয়োগপত্র দেখান। এরপর টাকা আনতে বলেন। কয়েক দিন পরে রমজানের মাধ্যমে তিনি সাড়ে ছয় লাখ টাকা দেন। এরপর অফিস সহায়ক পদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। এর আগে তাঁর মোবাইল ফোনে একটি এসএমএস আসে। নিয়োগপত্রের তারিখ অনুযায়ী ফেব্রুয়ারির ১৯ তারিখে যোগদানের জন্য ঢাকা সেনানিবাসে গেলে জানানো হয়, নিয়োগ হবে চট্টগ্রামে। এরপর তিনি ও দেবাশীষ চট্টগ্রাম যান। সেখানে ছয়-সাত দিন থাকার পর নিয়োগপত্র ভুয়া টের পেয়ে বাড়ি ফিরে আসেন।

তাঁদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চাকরির নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন ইউপি সদস্য বাসুদেব সিকদার। তিনি বলেন, ‘ইউপি মেম্বার খাজা মোল্যা আমাকে বলল, রমজান আমার ভাই। ওর কাছে টাকা দিলে মার যাবে না। তাই খাজার মাধ্যমে রমজানের কাছে এই তিনজনের টাকা দিয়েছি। খাজা মোল্যা বলেছে, টাকা আদায় করে দেবে।’

তবে খাজা মোল্যা বলেন, ‘আমি এসব নিয়োগের ব্যাপারে কিছুই জানি না।’

এভাবে মহাজন বাজারের অজয় বিশ্বাস মালি পদের জন্য রমজানের কাছে দেন পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে ঢাকা  থেকে নিয়োগপত্র নিয়ে চাকরি পাননি। কলাগাছি গ্রামের এরশাদ শেখ অভিযোগ করেন, ভাগিনা আবু তাহের গাজী এবং শালা হিরাঙ্গীর গাজীকে মালি পদে চাকরির আশ্বাস দেন রমজানের শ্যালক আহাদ শেখ। দুজনের চাকরির জন্য প্রথম পর্যায়ে সাড়ে ১১ লাখ টাকা দাবি করেন। পরে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। যথারীতি তাঁদের দুজনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়।

টাকা দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আরো রয়েছেন মাউলী গ্রামের হুমায়ুন শেখ, বাপ্পারাজ শেখ, সাদিয়ার মুসল্লি, শুক্তগ্রামের আজানুর শেখ, খুলনার দাকোপ উপজেলার আবু তাহের গাজী ও গোপালগঞ্জ সদরের হিরাঙ্গীর গাজী।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত রমজান কাঠাদুরা গ্রামের মৃত সবর শিকদারের ছেলে। রমজানের শ্যালক সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার। শ্যালকের মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখানো শুরু হয় কয়েক বছর আগে।

গত বছরের আগস্ট-অক্টোবরে এই তৎপরতা বাড়তে থাকে। সে সময় বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য পত্রিকায় প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখানো হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১৯ জনকে সেনাবাহিনীর ধোপা, বাবুর্চি, সুইপার ও মালি পদে ভুয়া নিয়োগপত্র দেওয়া হয়।

অভিযুক্ত রমজানের বাড়িতে গেলে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর স্ত্রী আছিয়া খাতুন কিছুই জানেন না বলে এড়িয়ে যান। ভাইদের নাম ভাঙিয়ে স্বামী এসব কেন করেছে—এই প্রশ্নের জবাবে আছিয়া বলেন, ‘ভাইদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো নেই।’ রমজানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের পাঁচটি নম্বরে কল করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

মাউলী ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. মকিদুর রহমান বলেন, ‘রমজান কয়েকজনকে সেনাবাহিনীতে চাকরির কথা বলে টাকা নিয়েছেন। এ নিয়ে তর্কও হয়েছে। এই চক্র যা করছে তাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।’

ঢাকা সেনানিবাসে কর্মরত রমজানের শ্যালক ওয়ারেন্ট অফিসারের মোবাইল ফোনে কল করলে তাঁর স্ত্রী ফোন ধরে নানা ধরনের প্রশ্ন করতে থাকেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে পরে ফোন করতে বলেন। ঘণ্টাখানেক পর কল করলে সংযোগ কেটে দেন। এরপর আবারও কল করলে রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে নড়াইলের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসিমউদ্দিন বলেন, ‘ঘটনা শুনেছি। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে বাহিনীর কাছে পাঠানো হবে।’

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেই সতর্কীকরণ তথ্য উল্লেখ করা থাকে। তাতে নিয়োগ পেতে কারো সঙ্গে আর্থিক লেনদেন না করার জন্য বলা হয়।

 



মন্তব্য