kalerkantho


ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ

একের পর এক কেলেঙ্কারি

শাহাদাত তিমির, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়   

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



একের পর এক কেলেঙ্কারি

২০১৫ সালের ১২ আগস্ট। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষক আব্দুল হালিমের ঝিনাইদহের আরাবপুরের ভাড়া বাসায় এক ছাত্রী আছেন—এ শুনেই স্থানীয় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতারা বাসাটিতে তল্লাশি চালান। পরে সেখান থেকে একই বিভাগের এক ছাত্রীকে আপত্তিকর অবস্থায় উদ্ধার করেন। অভিযোগ, বিভাগে ভালো ফলের লোভ দেখিয়ে ছাত্রীটির সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছেন ওই শিক্ষক। স্থানীয়দের দাবি, এর আগেও বেশ কয়েকবার এই ছাত্রীসহ বিভিন্ন মেয়ের তাঁর বাসায় যাতায়াত ছিল। 

২০১৮ সালে একই বিভাগের শিক্ষক সঞ্জয় কুমারের বিরুদ্ধে বিভাগের এক ছাত্রীকে মানসিক ও যৌন হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগের সূত্রপাত ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর। দেশরত্ন শেখ হাসিনা হলে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ সেলের সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান শেষে প্রশাসনের কাছে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের এক ছাত্রী। তবে অভিযোগে ইন্ধন দেওয়ার সন্দেহে সঞ্জয় কুমার অভিযোগকারীর বান্ধবীকে হয়রানি ও মানসিক নির্যাতন করে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের আরো কয়েকজন শিক্ষক এমন অভিযোগে অভিযুক্ত। এ কারণে ফিন্যান্স বিভাগ ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ ভাবছে না অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী। বিভাগের স্নাতক শেষ বর্ষের এক ছাত্রী বলেন, ‘আমাদের বিভাগে এই সমস্যাটা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে। গুটিকয়েক শিক্ষক এবং ছাত্রীর জন্য ক্যাম্পাসে আমাদের বের হওয়া মুশকিল হয়ে গেছে।’

বিভাগীয় সূত্রে জানা যায়, ইবির ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষ থেকে কার্যক্রম শুরু করে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ। বর্তমানে বিভাগে শিক্ষকসংখ্যা মাত্র পাঁচজন। বিভাগের সাবেক এক সভাপতিকে ছাত্রী যৌন হয়রানির দায়ে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে একের পর এক (নিয়োগ বাণিজ্য, যৌন নিপীড়ন ইত্যাদি) কেলেঙ্কারির জন্ম দিচ্ছেন বিভাগের কিছু শিক্ষক। অভিযুক্তদের মধ্যে কারো কারো শাস্তি হলেও বেশির ভাগ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের আস্থাভাজন হওয়ায় পার পেয়ে যান।

ফিন্যান্স বিভাগের সাবেক সভাপতি সহকারী অধ্যাপক মো. আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ করেন বিভাগটির এক ছাত্রী। অভিযোগ তদন্ত করে প্রমাণ পায় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩৬তম সিন্ডিকেটে তাঁকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করে কর্তৃপক্ষ। বিভাগের সাবেক সভাপতি রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে বিভাগের অনেক ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের এক ছাত্রীকে ফোনসহ উপহারসামগ্রী দিয়েছেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্যর অডিও ফাঁস, ৩০টি কম্পিউটারের দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে।

যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ সেলের সদস্য ও আইন প্রশাসক অধ্যাপক ড. রেবা মণ্ডল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এমন ঘটনা ন্যক্কারজনক। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে এমন অপরাধ কমানো যেতে পারে। সঙ্গে সচেতনতাটাও জরুরি।’

এদিকে কেলেঙ্কারির বিষয়ে ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন নীতি প্রয়োগ করেছে প্রশাসন। প্রতারণার অভিযোগ পাওয়ায় বিভাগের সাবেক সভাপতি আসাদুজ্জামানকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করে সিন্ডিকেট। একই বিভাগের শিক্ষক আব্দুল হালিম নিজ বাসায় ছাত্রীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় স্থানীয় নেতাদের হাতে আটক হন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রশাসনের কাছের লোক হওয়ায় শান্তি-শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা এক কর্তাব্যক্তি বিশ্বস্ত এক কর্মকর্তার মাধ্যমে ৪৯ হাজার টাকা দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে আনেন। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটিও করেনি প্রশাসন। তবে বিভাগের তৎকালীন সভাপতিকে ছাত্র উপদেষ্টাকে সঙ্গে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তৎকালীন উপাচার্য আব্দুল হাকিম সরকার। তবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এস এম আব্দুল লতিফ। এ ছাড়া সঞ্জয় কুমারের নামে অভিযোগ পেয়ে তাঁকে ডেকে সতর্ক ও তিরস্কার করেন উপাচার্য হারুন-উর-রশিদ আসকারী। রুহুল আমিন প্রশাসনের আস্থাভাজন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস দেখাচ্ছে না কেউ।

অর্থনীতি বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অধ্যাপক ড. আব্দুল মুঈদ বলেন, ‘ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু বিচার হওয়া জরুরি। তাহলে শিক্ষক হিসেবে আমরা মুক্তি পাব। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ইতিহাস বলে অভিযুক্তরা পার পেয়ে যাবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য শাহিনুর রহমান বলেন, ‘ওই বিভাগে আগেও কিছু অভিযোগ ছিল। আবারও অভিযোগ উঠেছে। আমরা অভিযোগ পেলেই বিষয়টি নিয়ে বসব এবং তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এর আগে শিক্ষকদের বিচারে পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগের ধরনের ওপর ভিত্তি করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।’

 



মন্তব্য