kalerkantho

শত প্রজাতি ধ্বংস

উপকূলের নদ-নদীতে নির্বিচারে চিংড়ির পোনা আহরণ

কৌশিক দে, খুলনা    

২৫ জুন, ২০১৮ ০০:০০



শত প্রজাতি ধ্বংস

খুলনার উপকূলীয় সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদীতে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে চিংড়ির পোনা আহরণ করা হচ্ছে। যার সঙ্গে উঠে আসে অন্তত এক শ প্রজাতির জলজ প্রাণ। আহরণকারীরা সেগুলো ফেলে দিয়ে নষ্ট করে।

দাকোপ, পাইকগাছা ও কয়রার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময়ে সুন্দরবনসংলগ্ন শিবসা, কড়ুলিয়া, মিনহাজ, কপোতাক্ষ, হাড়িয়া, গুনখালী, ভদ্রাসহ অভ্যন্তরীণ নদ-নদীগুলোতে মৎস্য সম্পদের অফুরন্ত ভাণ্ডার ছিল। এসব স্থানে চিংড়িসহ ১২০ প্রজাতির মাছ ও পোনা মিলত। ১৯৮০-এর দশকে উপকূলীয় এলাকায় লবণ পানিতে চিংড়ি চাষ শুরু হয়। প্রথমে প্রাকৃতিক উেসর পোনার ওপর ভিত্তি করে বাগদা-চিংড়ির চাষ গড়ে ওঠে। পরে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়ায় ধীরে ধীরে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে চাষ। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে মাছ চাষ হয়। ঘেরগুলোতে জানুয়ারি থেকে পোনা মজুদ করার মাধ্যমে মৌসুম শুরু হয়। সারা বছর চাষ হলেও জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পোনার চাহিদা থাকে। যার বেশির ভাগ পোনা হ্যাচারিতে উৎপাদিত হয়। কিন্তু, শত শত নারী-পুরুষ প্রতিদিন জোয়ারের সময় শিবসা নদীর সোলাদানা-দেলুটি খেয়াঘাট  থেকে সুন্দরবন অভ্যন্তরে নেট-জাল ব্যবহার করে পোনা ধরে। মূলত গভীর সমুদ্রে ডিম থেকে বের হয়ে নিশ্চল চিংড়ির লার্ভা ঢেউ ও জোয়ারের প্রভাবে মোহনা ও ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে চলে আসে। যোগ্য পরিবেশ ও বিভিন্ন ধরনের খাদ্যের সমন্বয়ে উর্বর এ অঞ্চল লার্ভার দ্রুত বর্ধনের জন্য উত্তম স্থান। পোনা সংগ্রহকারীরা বিভিন্ন ধরনের জাল দিয়ে বাগদার পোনা (পিএল) ও গলদার রেণু আহরণ করে। সংগ্রহকারীরা পোনা ও রেণু ব্যতীত অন্যান্য প্রাণী নদীতীরে ফেলে দেয়, যা পরে মরে শুকিয়ে বা পচে যায়।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট লোনাপানি কেন্দ্র পাইকগাছা ১৯৯১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত একটি জরিপ করে। এর শিরোনাম ছিল ‘সার্ভে অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট অব শ্রিম্প ফ্রাই রিসোর্স অব বাংলাদেশ।’ খুলনার শিবসা, কয়রা, ভদ্রা, কপোতাক্ষ, সাতক্ষীরার ইছামতী, কাকশিয়ালী, কালিন্দি, খলপেটুয়া, বাগেরহাটের মোংলা, পশুর, পানগুছি, পটুয়াখালীর আন্ধারমানিক, কুয়াকাটা, বরগুনার বিশখালী, বলেশ্বর, ভোলার মেঘনা নদীর নিম্নাঞ্চল, নোয়াখালীর মেঘনা নদীর নিম্নাঞ্চল, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, পতেঙ্গা, সমুদ্রসৈকত, কক্সবাজার, টেকনাফ, কতুবদিয়া, নাফ নদী ও চকরিয়া চ্যানেলসহ বিভিন্ন নদ-নদীতে অনুসন্ধান চালানো হয়। জরিপে প্রাপ্ত ফলাফলে বলা হয়, সংগ্রহকারীরা একটি বাগদার পোনা ধরতে চাপদা, বাগতারা, ডিমুয়া, রশনাই, ছটকাসহ ৩৮ প্রজাতির চিংড়ি; পারশে, ভেটকি, ভাঙনসহ ছয় প্রজাতির মাছ; এসিটেস, মাইসিড, মেগালোপা, কপিপড, অ্যালিমা, লার্ভি, আই সোপডসহ ৫৬ প্রজাতির অণুজীবসহ এক শ প্রজাতির জলজ প্রাণী নষ্ট করে। এতে এসব প্রজাতি হুমকির মুখে পড়ছে।

স্থানীয় চিংড়ি চাষি ও পোনা ব্যবসায়ী গোলাম কিবরিয়া রিপন বলেন, ‘বর্তমানে দেশে দেড় শতাধিকের বেশি হ্যাচারিতে চিংড়ির পোনা উৎপাদন হচ্ছে। চাহিদার শতভাগ পোনা এখন হ্যাচারিতে পাওয়া যায়। এ জন্য প্রাকৃতিক উেসর পোনার প্রয়োজন হয় না। তার পরও প্রাকৃতিক পোনা বর্ধনশীল ও লাভজনক বলে অনেকে এটি চাষ করেন।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জেলা সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘সচেতনতার অভাবে এভাবে চিংড়ি পোনা আহরণে দেশীয় মাছ সংকটে পড়ছে। এখনই আমরা চাষের মাছের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। এতে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হবে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে।’

পাইকগাছা নৌ পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদীতে নৌ পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালায়। যেসব এলাকায় পোনা ধরার প্রবণতা, সেখানে অভিযান জোরদার করা হবে।’



মন্তব্য