kalerkantho


মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে বন্যা

পানি কমছে, বাড়ছে দুর্ভোগ

রাজনগরে ২৫টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত
নবীগঞ্জ ও বাহুবলে পরিস্থিতির উন্নতি

নিজস্ব প্রতিবেদক, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ প্রতিনিধি    

২০ জুন, ২০১৮ ০০:০০



পানি কমছে, বাড়ছে দুর্ভোগ

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পতনউষার ইউনিয়নের ধূপটিলা গ্রামে বন্যার পানিতে বিধ্বস্ত ঘর। ছবিটি গতকালের। ছবি : কালের কণ্ঠ

মৌলভীবাজার জেলার বন্যাকবলিত এলাকার পানি কমছে, তবে বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ। পানি থাকা অবস্থায় যে কাঁচা ঘরগুলো দাঁড়িয়েছিল, পানি নামার পর সেসব ধসে পড়ছে। ভেসে ওঠা রাস্তায় বড় বড় অনেক গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। নলকূপগুলো বন্যায় ডুবে যাওয়ায় লোকজন বিশুদ্ধ পানীয় জল পাচ্ছে না। জীবজন্তু, গাছের পাতা, লতা পচে যাওয়ায় চারদিকে উৎকট দুর্গন্ধ। 

এদিকে সোমবার দিবাগত রাতে জেলার পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবাহিত কুশিয়ারা নদীর বাঁধ হলদিগুলের কাছে প্রায় ৩০ ফুটের মতো ভেঙে গেলে রাজনগর উপজেলার ফতেপুর ও উত্তরবাগ ইউনিয়নের ২৫টি গ্রাম নতুন করে বন্যাকবলিত হয়েছে।

কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৩৬ ইউনিয়নের প্রায় আড়াই লাখ মানুষ বন্যাকবলিত হয়। মনু ও ধলাই নদের পানি বিপত্সীমার নিচে নেমে যাওয়ায় সোমবার থেকে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। গতকাল মঙ্গলবার পরিস্থিতির আরো উন্নতি হয়। তবে আশ্রয়কেন্দ্রে ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের অনেকেই এখনো নিজ বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। কমলগঞ্জের পনতউষার গ্রামের আবদুল হান্নান চিনু জানান, পানি নামলেও তাঁর ঘর বসবাসের উপযোগী নেই। তাঁর আশপাশের শতাধিক কাঁচা ঘর ধসে পড়েছে। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষ দ্রুত নতুন ঘর নির্মাণ করতে পারবে না।

রাজনগরের কামারচাক ইউনিয়নের মশাজান গ্রামের জয়নাল আবেদীন শিবু বলেন, ‘আমার পাকা ঘর থেকে পানি নেমেছে। কিন্তু আমার স্ত্রী ও দুটি শিশুসন্তান আছে। চারদিকে পচা গন্ধে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে কি না; তাই স্ত্রী-সন্তানকে আত্মীয়র বাড়ি থেকে বাড়িতে আনছি না। তাছাড়া নলকূপটাও বন্যায় ডুবে ছিল। এর পানি তো বিশুদ্ধ নয়।’

মৌলভীবাজার পৌর এলাকার পূর্ব হিলালপুরের সালেহ এলাহী কুটি বলেন, ‘আমার বাড়ি থেকে বের হওয়ার পিচ রাস্তার চার স্থানে কোমর পর্যন্ত বড় বড় গর্ত হয়েছে। এসব গর্ত ও শহরের বারইকোনার ভাঙন দিয়ে এখনো মনু নদের স্রোত বয়ে যাচ্ছে।’

শমশেরনগরের নূরুল মোহাইমিন মিল্টন জানান, বন্যায় কুলাউড়ার শরীফপুর ইউনিয়নে একটি বড় কালভার্ট দেবে যাওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারতের ব্যবসায়ীদের আমদানি-রপ্তানি বন্ধ হয়ে আছে। সড়ক ও জনপথের সিলেট বিভাগের অতিরিক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা ও সেনাবাহিনীর লে. কর্নেল শাহাব উদ্দীন কালভার্ট পরিদর্শন করেন। এখানে একটি বেইলি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফয়জুর রহমান কমলগঞ্জে সাড়ে চার হাজার বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝে ২০ কেজি করে চাল বিতরণ করেন। তিনি বলেন, বিধ্বস্ত বাড়িঘর ও ভেঙে যাওয়া সড়ক মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে গতকাল কালের কণ্ঠকে বলা হয়, জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়ন ৩৬টি ও পৌরসভা দুটি। বন্যাক্রান্ত মানুষ দুই লাখ ৬১ হাজার ৬৫৩। ৬৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১২ হাজার ৪০৫ জন আশ্রয় নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এ পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা ও এক হাজার ১৬৭ টন চাল। সোমবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া মৌলভীবাজার সফরকালে তাৎক্ষণিক বরাদ্দ দেওয়া এক হাজার বান্ডিল টিন ও ৩০ লাখ টাকার তথ্য বন্যানিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে নেই।

গতকাল সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন মৌলভীবাজার পৌর এলাকার সৈয়ারপুরে লোকনাথ সেবা আশ্রম ও সদর উপজেলার শেরপুরের আজাদ বখত উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজে ত্রাণ বিতরণ করেন। উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য সৈয়দা সায়রা মহসীন, জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান, পুলিশ সুপার শাহ জালাল, সমাজসেবা অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক সৈয়দা ফেরদৌসি আক্তার, জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আহাদ মিনার প্রমুখ।

এদিকে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে (২৫টি গ্রাম) বেশি না হলেও বাহুবল উপজেলার (৩০টি গ্রাম) প্লাবিত এলাকার পানি নেমে গেছে গতকাল। হবিগঞ্জ শহরের মাছুলিয়া এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত খোয়াই নদীর বাঁধ এখনো মেরামত করা হয়নি। ফলে আবার বৃষ্টি হলে অথবা ভারত থেকে পানি এলে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যেতে পারে। হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এম এল সৈকত জানান, বাঁধটি মেরামতের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।



মন্তব্য