kalerkantho


নরসিংদী

ভাটায় বেঁকেছে মেঘনার স্রোত

মনিরুজ্জামান, নরসিংদী   

২৫ মে, ২০১৮ ০০:০০



ভাটায় বেঁকেছে মেঘনার স্রোত

নরসিংদী সদর উপজেলার শ্রীনগর পঞ্চবটীতে ইটভাটা তৈরি করেছে মেসার্স হারিছ অ্যান্ড সন্স। নদীতে মাটি ও ইটের খোয়া ফেলে দখল করে ফেলেছে। এতে স্রোতের বাঁক তৈরি হয়েছে। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

নরসিংদীর একটি ইটভাটা মাটি ফেলে মেঘনা নদীর প্রায় ৫০০ গজ ভরাট করায় স্রোতে বাঁক তৈরি হয়েছে। এতে নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় সরেজমিনে দেখা গেছে, সদর উপজেলার শ্রীনগর পঞ্চবটিতে মেঘনা নদীর তীরঘেঁষে মেসার্স হারিছ অ্যান্ড সন্স (এমএইচএস) ব্রিক ফিল্ড তৈরি হয়েছে। ভাটার পূর্ব, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পাঁচ-সাতজন শ্রমিক বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কাঁচা ইট ও মাটি নদীতে ফেলে ভরাট করছে। এ ছাড়া নদীর তীরে তিন-চারটি খোলা পায়খানা তৈরি করা আছে। এগুলো থেকে সরু পাইপের মাধ্যমে ময়লা ফেলা হচ্ছে নদীতে। এতে পানি দূষিত হচ্ছে।

ভাটা শ্রমিক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০২ সালে নদীর পাড়ঘেঁষে স্থানীয় আব্দুল হক মিঞা এমএইচএস ভাটা স্থাপন করেন। সরকারি বিধি মোতাবেক, একটি ভাটায় দুই একরের বেশি জমি ব্যবহার করা যায় না। তবে এমএইচএস দুর্গম চরাঞ্চলে হওয়ায় প্রশাসনের নজর এড়িয়ে প্রায় ১৭ একরের বেশি জায়গায় ভাটা নির্মাণ করেছে। পাশাপাশি প্রতি বছর নদীর পার ঘেঁষে ভাঙা ইট ও মাটি ফেলে ভরাট করছে।

তবে নরসিংদী ১ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হীরুর (বীরপ্রতীক) উদ্যোগে মেঘনাসহ ছয়টি নদী খনন করা হচ্ছে। এ জন্য ৫০০ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয় হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। গত ২৮ এপ্রিল নরসিংদী সদরের শুঁটকীকান্দিতে মেঘনা নদীর পশ্চিম চ্যানেলে এই কাজের উদ্বোধন করেন প্রতিমন্ত্রী। তখন তিনি এমইচএস ভাটার মেঘনা ভরাট দেখতে পেয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসককে (ডিসি) নির্দেশনা দেন। জেলা উন্নয়ন সমন্ব্বয় সভায় ডিসি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) নির্দেশ দিয়েছেন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের নরসিংদী কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আকতারুজ্জামান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুুক শ্রীনগর ঘাটের ইঞ্জিনচালিত নৌকার মাঝি বলেন, ‘হক সাবেরে কেউ কওয়ার নাই। মন মতন মাটি আর ইট দিয়া নদীডা ভরাট কইরা কিমুন বেহা বানাইয়া দিছে। দিনে কন আর রাইতে কন—দুই বেলাই নৌকা চালাইবার সময় ঝামেলা লাগে। কিচ্ছুুু দেহা যায় না।’

শ্রীনগরের একাধিক বাসিন্দা জানান, দৈনন্দিন কাজ গোসল থেকে শুরু করে কাপড়-চোপড় ধোয়া, হাঁড়ি, পাতিল ধোয়াসহ সব কাজ নদীর পানি দিয়ে করতে হয়। আর সেই নদীতে ভাটার পায়খানার ময়লা ছাড়ছে। মালিককে বলেও কোনো কাজ হয়নি।

নরসিংদী লঞ্চ মালিক সমিতির সুপারভাইজার ইদ্রিস মিয়া বলেন, ‘এমনিতে অনেক চর ভাইসা নদী ছোট হইয়া গেছে। এর মধ্যে শ্রীনগরের হারিছ কম্পানির ভাটা দিন দিন দখলে ওইখানে নদী অনেক সরু হয়ে গেছে। এতে লঞ্চ চলাচলে অনেক সমস্যা হয়। চালকরা একাধিকবার এই সমস্যার কথা আমাদের বলেছে। এ বিষয়ে আমরা কয়েকবার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসেছিলাম। কিন্তু কোনো সমাধানে যেতে পারেনি।’

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) নরসিংদী শাখার ট্রাফিক পরিদর্শক আবদুল আজিজ বলেন, ‘ইটভাটা প্রায় ৫০০ গজের ওপরে একেবারে নদীর ভেতরে ঢুকে গেছে। এতে নৌচলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তিন-চার মাস আগে বিআইডাব্লিউটিএ বন্দর শাখার পরিচালক সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। তখন তিনি নদীর ওপর থেকে ভাটা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পাশাপাশি ভাটার অফিস কক্ষ ও কাঁচা ইট ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন।’

এমএইচএস ব্রিক ফিল্ডের মালিক মো. আব্দুল হক মিঞা বলেন, ‘এই ভাটা প্রায় ২২ বছর আগে তৈরি করেছি। বর্তমানে প্রায় ৫০ বিঘা জমি রয়েছে। এর মধ্যে আমি ৪০ বিঘা জমির বাণিজ্যিক খাজনা দিই। যদি অবৈধভাবে দখল করতাম, তাহলে খাজনা দেওয়া যেত না। আমি ডিসি অফিসের এলআর ফান্ডেও টাকা দিই।’ বাঁক নিয়ে বলেন, ‘রেকর্ডিয় নকশার মধ্যেই নদীর অনেক বাঁক রয়েছে। এটি আমার সৃষ্ট না।’

জেলা নদী রক্ষা কমিশনের সদস্যসচিব ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আগামী রবিবার নদী রক্ষা কমিশনের বৈঠক। সেখানে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে। ভাটাটি নদীগর্ভের সীমানা অথবা কৃষি জমিতে করে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদীর বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’



মন্তব্য