kalerkantho

অচল বড়পুকুরিয়া

দিনাজপুর প্রতিনিধি   

১৮ মে, ২০১৮ ০০:০০



অচল বড়পুকুরিয়া

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির শ্রমিক ধর্মঘটের পঞ্চম দিনেও অচলাবস্থা কাটেনি। খনির আবাসিক এলাকায় অবরুদ্ধ হয়ে আছেন খনির দেশি-বিদেশি ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ শিশুদের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। খনি এলাকার ভেতরের ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কম্পানি স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিকে গত মঙ্গলবার খনিতে শ্রমিকদের হামলায় ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হওয়ার ঘটনায় পার্বতীপুর থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখসহ ৫০ শ্রমিককে আসামি করে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে খনি কর্তৃপক্ষ বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কম্পানি লিমিটেড (বিটিএমসিল) খনি এলাকার মন মেলা অফিসার্স ক্লাবে এক প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে। এতে তারা মঙ্গলবার খনির মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড এক্সপ্লোরেশন), প্রকল্প পরিচালকসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হওয়ার বিস্তারিত বিবরণ প্রজেক্টরের মাধ্যমে তুলে ধরে। তারা জানায়, ‘খনি কর্তৃপক্ষ কয়লা উত্তোলনের জন্য চীনা কম্পানির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক্সএমসি-সিএসসি কনসোর্টিয়ামকে কাজ দিয়েছে। যে শ্রমিকরা আন্দোলন করছে, তারা খনির নিযুক্ত শ্রমিক নয়। তারা এক্সএমসি-সিএসসি কনসোর্টিয়ামের শ্রমিক। তাদের কোনো দাবি থাকলে তারা এক্সএমসি-সিএসসিকে জানাবে। আমরা তাদের কোনো অথরটি নই। কিন্তু খনির শ্রমিক নয়, এমন ছয়জন বহিরাগত তাদের (শ্রমিক) ভুল বুঝিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে উসকে দিয়ে খনিতে অচলাবস্থা সৃষ্টি করছে।’

খনি কর্তৃপক্ষের দাবি, যারা আন্দোলন উসকানি দিচ্ছে তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগে সম্প্রতি যোগদানকারী নেতা মশিউর রহমান বুলবুল, ওযাজেদ, মিজানুর রহমান মিজান, আফজাল পেট্রোবাংলা বা চীনা কম্পানি কারোরই শ্রমিক নয়। তারা বহিরাগত। তবে আবু সুফিয়ান, রবিউল ইসলাম চীনা কম্পানির শ্রমিক।

প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন খনি কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিব উদ্দিন আহম্মেদ, সহব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম, মহাব্যবস্থাপনা পরিচালক (মাইনিং অপারেশন) এ বি এম নুরুজ্জামান চৌধুরী, মহাব্যবস্থাপক (সারফেস অপারেশন) সাইফুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড এক্সপ্লোরেশন) ও প্রকল্প পরিচালক এ টি এম কামরুজ্জামান ও মাসুদ হালদার। তাঁরা জানান, হামলায় আহত তাঁদের পাঁচ কর্মকর্তা দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

এদিকে মঙ্গলবার সকালে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের সংঘর্ষের পর শ্রমিকদের উপস্থিতি আরো বাড়িয়েছে আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনের ফলে খনির স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়েছে। শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কম্পানি স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে প্রশাসনের সমঝোতা বৈঠকটি অমীমাংসিত অবস্থায় ভেঙে যাওয়ার পর শ্রমিকরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

অবরুদ্ধ অবস্থা : খনি সদর দপ্তরের ভেতরে বাসকারী গাড়িচালক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, ‘বাড়িতে বাজার নাই, শিশুদের খাদ্যও নাই। রমজান মাস শুরু হচ্ছে, অথচ বাজার করা তো দূরের কথা, বাড়ি থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না।’ একই কথা বলেন খনি সদর দপ্তরে বাসকরা বিক্রয় বিভাগের ম্যানেজার (প্রশাসন) সৈয়দ হাছান ইমামসহ অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

মঙ্গলবার সংঘর্ষে আহত অনেক কর্মকর্তার অবস্থা অবনতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের আন্দোলনের নামে খনিতে কর্মরত চীনা, ব্রিটিশ ও আমেরিকান ৩১০ জন বিদেশি নাগরিক ও ২০০ বাংলাদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছি। দেখা দিয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ খাদ্যের অভাব। শিশুদের খাদ্যও সংকট দেখা দিয়েছে। খনির ভেতরের একমাত্র ডিপার্টমেন্টাল স্টোরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্টোরের জন্য ভ্যানযোগে আনা জিনিসপত্র ও খাদ্যসামগ্রী বুধবার বিকেলে লুটপাট করা হয়েছে।’

ঢাকার মিটিং প্রত্যাখ্যান : হাবিব উদ্দিন দুটি মামলার বিষয় নিশ্চিত করে জানান, আগামী সোমবার পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও খনি কর্তৃপক্ষের মধ্যে ঢাকায় মিটিংয়ের জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তার পরও শ্রমিকরা তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করছে না। খনি আন্দোলনের নেতা আবু সুফিয়ান বলেন, ‘আমরা ঢাকায় গিয়ে বৈঠক করতে রাজি নই। আমরা চাই, এই এলাকার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারের নেতৃত্বে খনিতে সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত আমরা খনিগেটে শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচি চালিয়ে যাব।’

উল্লেখ্য, ১৩ মে থেকে ১৩ দফা দাবিতে শ্রমিক ধর্মঘট করছে বড়পুকুরিয়া খনি শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন ও ছয় দফা দাবিতে খনির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ২০ গ্রামবাসী আন্দোলন করে আসছে। খনি এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।

 


মন্তব্য