kalerkantho


জামালপুর রেলস্টেশন

টিকিট প্রাপ্তিস্থান ‘কালোবাজার’

জামালপুর প্রতিনিধি   

১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



টিকিট প্রাপ্তিস্থান ‘কালোবাজার’

জামালপুর রেলস্টেশনে চারটি আন্ত নগর ট্রেনের টিকিট যেন সোনার হরিণ। সকাল ৮টায় টিকিট বুকিং কাউন্টারের কম্পিউটার চালুর তিন-চার ঘণ্টার মধ্যেই ফুরিয়ে যায় ১০ দিন আগের অগ্রিম টিকিট। কিন্তু টিকিটের বেশির ভাগই চলে যায় কালোবাজারিদের হাতে। অনেক ট্রেনযাত্রী কাউন্টারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও টিকিট পায় না। তবে কাউন্টারের সামনেই বা স্টেশন এলাকায় কালোবাজারিরা ১৬০ বা ১৯০ টাকার টিকিট বেচে ৪০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকায়। স্টেশনের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে কালোবাজারিদের যোগাযোগ আছে বলে অভিযোগ।

রেলওয়ে পুলিশ ও স্টেশন কর্তৃপক্ষ কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। তাই কয়েক গুণ বেশি দামেই টিকিট কিনতে হয় বেশির ভাগ যাত্রীকে।    

স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, জামালপুর-ঢাকা রেলপথে যাত্রীবাহী আন্ত নগর ‘তিস্তা’, ‘ব্রহ্মপুত্র’, ‘যমুনা’ ও ‘অগ্নিবীণা’ ট্রেন চলে। তিস্তা ট্রেনের ঢাকার আসন রয়েছে শোভন চেয়ার ১২০টি, এসি কেবিন ১৫টি, এসি চেয়ার ৪৫টি এবং নন-এসি ১৫টি।

ব্রহ্মপুত্র ট্রেনের ৯১টি শোভন, ৫০টি শোভন চেয়ার ও প্রথম শ্রেণির ১২টি আসন। যমুনা ট্রেনের ৮৫টি শোভন, ৫০টি শোভন চেয়ার ও প্রথম শ্রেণির ২৮টি আসন এবং অগ্নিবীণা ট্রেনের ১২০টি শোভন, ৫০টি শোভন চেয়ার ও প্রথম শ্রেণির ২৮টি আসন।

নিয়ম অনুযায়ী, ১০ দিন আগে অগ্রিম টিকিট বিক্রি করা হয়। গত মঙ্গলবার ছিল ২৪ মের চারটি আন্ত নগর ট্রেনের টিকিট বিক্রির নির্ধারিত দিন। সকাল ৮টায় বুকিং কাউন্টারের কম্পিউটার চালু করা হয়। দুপুর ১২টার মধ্যে ‘তিস্তা’র ১৯৫টি টিকিটের সব, আর বাকি তিনটি ট্রেনের অর্ধেকের বেশি টিকিট বিক্রি হয়ে যায়।

এভাবে প্রতিদিন চারটি ট্রেনের টিকিট ১০ দিন আগেই বিক্রি হয়ে যায়। আর টিকিটের বেশির ভাগই চলে যায় স্থানীয় কালোবাজারিদের হাতে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জামালপুর রেলওয়ে স্টেশনের বুকিং কাউন্টারের সহকারী বুকিং মাস্টারদের সঙ্গে রয়েছে কালোবাজারিদের গোপন যোগাযোগ। তাঁদের বাড়তি টাকা দিয়ে কাউন্টারের ভেতর থেকেই কম্পিউটারে সিঙ্গেল টিকিট বুকিং দিয়ে টিকিট বের করে কালোবাজারিদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়। কালোবাজারিরা দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে লোক (কামলা) রেখে তাদের লাইনে দাঁড় করিয়েও টিকিট কিনে নেয়।

এ ছাড়া স্টেশন মাস্টার নিজে টিকিট কিনে রেখে সেগুলো দিয়ে ‘ভিআইপি (যাত্রী)’ সামাল দেন। এতেও শত শত টিকিট ব্লক হয়ে যাওয়ায় যাত্রীরা সময়মতো প্রকৃত মূল্যে টিকিট পায় না। এই ভিআইপিরা হলেন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, তাঁদের অনুসারী থেকে প্রভাবশালীরা।

কালোবাজারিদের ‘কামলা’রা মুঠোফোনে কল করে স্টেশন এলাকার বাইরে বা বাসা-অফিসে ক্রেতাকে টিকিট দিয়েও আসে। স্থানীয় লিটন আগে ঠেলাগাড়ি চালাতেন। এখন টিকিট কালোবাজারি করে প্রতিদিন অনেক টাকা আয় করেন। তাঁর আছে প্রায় ১৫ জন কামলা। লিটন বলেন, ‘আমি আমার লোক দিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে ১০ দিন আগেই অগ্রিম টিকিট কিনি। সেই টিকিট আমি বাইরে বিক্রি করি। ১৬০ টাকার একটি শোভন ও ১৯০ টাকার একটি শোভন চেয়ার টিকিট ৪০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। প্রশাসনের লোক, ম্যাজিস্ট্রেট, সাংবাদিক, নেতা থেকে অনেকেরই ফোন নম্বর আছে আমার কাছে। তারা চাইলে তো আর না করতে পারি না।’

স্টেশন এলাকার ইয়াছিন, পারভেজ, মুসলিম, আনজুসহ আরো আটজনও কামলা খাটিয়ে টিকিট বেচেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মুসলিম শহরের বাগানবাড়ি মোড়ে তাঁর পান দোকান থেকেই টিকিট বেচেন। দোকানটি ‘মিনি টিকিট কাউন্টার’ নামে পরিচিত।

এক কালোবাজারি জানান, তাঁরা সব দিক ম্যানেজ করেই টিকিটের কারবার করেন। ইয়াছিন স্টেশনে হোটেল ব্যবসার আড়ালে টিকিট কারবারে জড়িত। টিকিট কালোবাজারিদের প্রত্যেকেই আজ অনেক টাকার মালিক বনে গেছেন।   

মঙ্গলবার সকালে টিকিট বুকিং কাউন্টারের সামনে যাত্রী আসাদুল ইসলাম কালোবাজারির কাছ থেকে মঙ্গলবারের অগ্নিবীণা ট্রেনের ঢাকার দুটি শোভন চেয়ার টিকিট কিনলেন ৮০০ টাকায়। তিনি বলেন, ‘কী করব, কাউন্টারের টিকিট ১০দিন আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। আজ টিকিট পেলাম যে এটাই ভাগ্য।’ 

জামালপুর রেলওয়ে স্টেশনে দিনে-রাতে প্রকাশ্যে কালোবাজারিদের টিকিট বিক্রি করতে দেখা গেলেও তাদের বিরুদ্ধে রেলওয়ে পুলিশ বা অন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবস্থা নেয় না। অথচ রাতে স্টেশন এলাকায় আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর গাড়ি টহল দেয়। স্টেশন এলাকার প্রায় প্রতিটি খাবার হোটেল, আবাসিক হোটেল, চা-পানের দোকানে, রেলওয়ে মসজিদের পশ্চিম পাশের গলিতে টিকিট হাতবদল হয়। 

জামালাপুর রেলওয়ে স্টেশনের প্রধান বুকিং সহকারী গোলম মর্তুজা তাঁর বুুকিং কাউন্টারের কেউ টিকিট কালোবাজারিদের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘কালোবাজারিরা কাউন্টারের বাইরে যাত্রীবেশে লাইনে দাঁড়িয়ে অগ্রিম টিকিটিগুলো কিনে বাইরে চড়া দামে বিক্রি করে বলে অনেক অভিযোগ পাই। আমরা রেলওয়ে পুলিশকে এসব জানিয়ে থাকি। কিন্তু তাদের তৎপরতা লক্ষ করা যায় না।’ 

জামালপুর রেলওয়ে থানার ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) মো. জুলফিকার আলী বলেন, ‘আমরা সব সময় চেষ্টা করি, চিহ্নিত কোনো কালোবাজারি যাতে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কিনতে না পারে। সর্বশেষ গত নভেম্বরে ভ্রাম্যমাণ আদালত আমিনুল ইসলাম নামের স্থানীয় টিকিট কালোবাজারিকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জানুয়ারিতে লিটন নামের একজন কালোবাজারিকে টিকিটসহ আটক করে জেলে পাঠানো হয়। এরপর গত চার মাসে কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।’

তিনি বলেন, ‘রেলওয়ে থানার তালিকায় অন্তত ১২ জন টিকিট কালোবাজারির নাম রয়েছে। তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে রাখা হয়।’

জামালপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘টিকিট বুকিং কাউন্টার থেকে কিংবা আমার দপ্তর থেকে কালোবাজারিদের কাছে কেউ টিকিট বিক্রি করে না। কাউন্টারের সামনে যাত্রীবেশে লাইনে দাঁড়িয়ে অনেক কালোবাজারি টিকিট কিনে নিচ্ছে শুনেছি। তাদের বিরুদ্ধে রেলওয়ে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘অনলাইন পদ্ধতি চালু হওয়ায় জামালপুরে বুকিং কাউন্টারের কম্পিউটারে আর টিকিট আটকে বা ব্লক করে রাখা যায় না। তবে ভিআইপিরা (প্রশাসন বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) টিকিটের প্রয়োজন পড়লে আমার ওপরই চাপ আসে। এ জন্য আমি ১০-১৫টি টিকিট কাউন্টার থেকে কিনে আমার কাছে রেখে দিই। ভিআইপি কেউ চাইলে সেই টিকিট দিয়ে চাপ সামাল দিতে হয়।’



মন্তব্য