kalerkantho


ভূমিকম্প

ঝুঁকিতে সিলেট, ৫.২ মাত্রায় ফের কম্পন

সিলেট অফিস   

২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



ঝুঁকিতে সিলেট, ৫.২ মাত্রায় ফের কম্পন

ভূমিকম্প নাড়া দিলে নগরের মানুষগুলোও নড়েচড়ে বসে। চিন্তার জায়গাও নাড়া খায় কিছুদিন। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রশাসনের মনে পড়ে ‘সিলেট ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা।’ এর কিছুদিন পর সবাই তা ভুলে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেট ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার (ডেঞ্জার জোন) মধ্যে পড়েছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ডাউকির ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে শহরটির অবস্থান। অন্যদিকে শাহবাজপুর ফল্টও (ভূগর্ভস্থ দুটি প্লেটের সংযোগস্থল, হবিগঞ্জ-কুমিল্লা এলাকাধীন) সিলেটের কাছাকাছি। এই দুই কারণে সিলেট ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের ঝুঁকিভেদে বাংলাদেশকে তিনটি বলয়ে ভাগ করা হয়েছে। তার মধ্যে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলয় অর্থাৎ প্রথম বলয়ে সিলেটের অবস্থান। এখানে ৭ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৮ মিনিটে সিলেট অঞ্চলে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল মিয়ানমারের মাওলাইকে। ভূমিকম্পের পর থেকে সারা দিন চায়ের কাপে আলোচনায় ঘুরেফিরে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চ জেলা সমন্বয়কারী ও লিটল বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রশাসক প্রণব জ্যোতি পাল জানান, বিভিন্ন সময়ে ভূমিকম্পবিষয়ক সেমিনারে তিনি অংশ নিয়েছেন। তা থেকে জেনেছেন, কত ভয়ংকর ঝুঁকির মধ্যে আছে সিলেট। কিন্তু এ বিষয়ে প্রশাসনসহ সবাই উদাসীন। প্রতিবার ভূমিকম্প হলে সবাই নড়েচড়ে বসে, কিছুদিন তোড়জোড় চলে। তারপর সব আগের মতো। তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্প ঠেকানোর সাধ্য কারো নেই। কিন্তু যথাযথ পদক্ষেপ ও সচেতনতা তৈরি করা গেলে প্রাণহানি কমিয়ে আনা যায়।’

তিনি আরো জানান, নগরের বেশিরভাগ বাড়িঘরে বিল্ডিং কোড মানা হয়নি। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠায় পুরো নগর ঘিঞ্জি হয়ে আছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাস্তাঘাট অপ্রশস্ত। এতে ভূমিকম্প হলে উদ্ধার অভিযান চালানো কঠিন হয়ে যাবে।

তরুণ আইনজীবী রণেন সরকার বলেন, ‘সকালে ভূমিকম্প হওয়ার পর থেকেই সবার চোখেমুখে একধরনের আতংক। সিলেট যে ভূমিকম্পের ডেঞ্জার জোনে অবস্থিত, এটা অনেকেই জানেন। কিন্তু এ বিষয়টি এখনো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এটা খুবই হতাশাজনক।’

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও প্রকৌশল বিভাগ, সিলেট ডিজাস্টার ফোরামের গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরের ৯৫ ভাগ ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। তীব্র মাত্রার ভূমিকম্প হলে নগর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। ৪.৪ শতাংশ ভবন বাদে নগরের সব ভবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শুধু ভবনধসে ৫০০ কোটি টাকার ওপর ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। মারাত্মকভাবে আহত হতে পারে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি মানুষ।

কয়েক বছর আগে জাপান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের একটি বিশেষজ্ঞ দল সিলেট নগরের অনেকগুলো ভবনের ওপর জরিপ চালিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে বলা হয়, সিলেটে যে পরিমাণ বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে তাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে।

সিলেট ফায়ার সার্ভিসের মতে, ভূমিকম্প হলে সিলেট নগরের মধ্যে ৫, ৯, ১৭ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ড সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর কারণ হিসেবে ঘনবসতি, অবকাঠামো ও মাটির তরলীকরণকে দায়ী করা হয়েছে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক জহির বিন আলম বলেন, ‘১০০ বছর পর পর বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকে। সিলেটে সর্বশেষ বড় ভূমিকম্পের পর ১০০ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। নতুন করে কিছু ফল্টলাইন দেখা যাচ্ছে। এ লাইনগুলো খুবই সক্রিয়। ফল্টলাইন সক্রিয় হলে ভূমিকম্পের আশঙ্কা বেড়ে যায়।’ তিনি জানান, ভূমিকম্পের মাত্রা অনুসারে বাংলাদেশকে তিনটি ভূকম্পন বলয়ে ভাগ করা হয়েছে। এক নম্বর বলয়ে ভূমিকম্পের মাত্রা রিখটার স্কেলে ৭ থেকে ৯ বা তার অধিক হতে পারে। এই এক নম্বর বলয়েই আছে সিলেট। সিলেট ছাড়াও এ বলয়ের আওতাভুক্ত এলাকা হচ্ছে ময়মনসিংহ, রংপুর এবং উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, সিলেট অঞ্চলে ১৯৯৫ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বছরে প্রায় ৩০০ বার মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। তবে এর পর থেকে কতবার ভূমিকম্প হয়েছে তাত্ক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি। সিলেট ডিজাস্টার ফোরাম আয়োজিত একাধিক সেমিনারে গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সিলেটে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেন।

আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘আসলে কোন এলাকার জন্য কত রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সেটা বলা মুশকিল। হাইতিতে যে মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে সিলেটে হয়তো সেটা আরো বেশি ক্ষতিকর হবে। আবার দেখা যাবে এখানে মধ্যমাত্রার ভূমিকম্পও অনেক বেশি ক্ষতি করেছে।’

এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘নগরবাসীকে সচেতন করতে বিভিন্ন সময়ে কর্মশালা থেকে শুরু করে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। ভূমিকম্প মোকাবেলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি আমাদের নেই। কিন্তু একটু সচেতন হলেই ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। সিটি করপোরেশন সেই কাজ করে যাচ্ছে।’

 

 



মন্তব্য