kalerkantho


রেমা-কালেঙ্গা বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য

সবুজ বনে দানব কুড়াল

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সবুজ বনে দানব কুড়াল

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বন। শুকনা ও মিশ্র চিরহরিৎ সবুজ এই বনের গাছ চুরি থামানো যাচ্ছে না। বন কেটে অবৈধভাবে কৃষিজমি বাড়ানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে বনের ২৫ শতাংশ জমি উজাড় হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, অভয়ারণ্যটি ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত। আয়তন এক হাজার ৭৯৫ হেক্টর। একে সরকার ২০০৫ সালে অভয়ারণ্য ঘোষণা করেছে। এর উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণে সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। বনের আশপাশে বসবাস করে কিছু সাঁওতাল, ওঁরাং, চাকমা, মারমা ও মণিপুরি সম্প্রদায়। এ ছাড়া সত্তর-আশির দশকে নোয়াখালীর নদীভাঙা মানুষজনকে পুনর্বাসন করা হয়। বর্তমানে সংখ্যায় এরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ছাড়িয়ে গেছে। তারা এ বনের ভিলেজার হিসেবে পরিচিত। অভয়ারণ্য লাগোয়া সমতলে ফসল বোনার জন্য ভিলেজার পরিবারপ্রতি এক কেয়ার (৩৬ শতাংশ) করে জমি বরাদ্দ দিয়েছে বন বিভাগ। কিন্তু অসাধু কর্মচারীদের সহায়তায় বন কেটে এই জমি বাড়িয়েছে ভিলেজাররা। ৩০ থেকে ৫০ কেয়ার জমির মালিক হয়েছে কেউ কেউ। প্রতিবছর ভিলেজারদের এই জমি বাড়ছে। তারা পাহাড় কেটে আবাদ করছে। গাছ কেটে পাচার করে হয়েছে লাখ লাখ টাকার মালিক। কেউ হয়েছে কোটিপতি।

কালেঙ্গা রেঞ্জের চারটি বন বিটের মধ্যে রশিদপুরের অধিকাংশ গাছ ২০০১-০২ সালে উজাড় হয়। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে এ বিটে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে গাছ লাগানো হয়। বর্তমানে এই গাছও কাটা হচ্ছে।

একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতি রাতে বনের কোথাও না কোথাও গাছ কাটা পড়ছে। এগুলো পরে ট্রাক্টর, টেম্পো, ঠেলা ও ভ্যানে করে পাচার হচ্ছে। এই গাছ কাটা চক্রে পূর্বাঞ্চলের মিরাশী, রানীগাঁও, গাজীপুর ইউনিয়নের ২০-২২টি গ্রামের তিন শতাধিক লোক জড়িত। রাত হলে তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বনে ঢোকে। কাটা গাছগুলো উপজেলা সদরসহ জেলার মিরপুর, বাহুবল ও শায়েস্তাগঞ্জে বিক্রি করে। সেখান থেকে গোল, চিরাই কাঠ ও ফার্নিচার হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে। এ জন্য তারা স্থানীয় পুলিশ, বন বিভাগ ও কথিত জনপ্রতিনিধিদের মাসিক ও সাপ্তাহিক হারে চাঁদা দেয়। এভাবে রেমা-কালেঙ্গা ও ছনবাড়ি বিট থেকে প্রতিদিনি সহস্রাধিক ঘনফুট কাঠ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হয়।

রেমা-কালেঙ্গা সহব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও সাবেক সরকারি কৌঁসুলি আকবর হোসেন জিতু জানান, বন বিভাগের লোকবল কম। বন উজাড় হতে থাকায় সরকার বন বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় জনসাধারণকে নিয়ে একটি সহব্যবস্থাপনা কমিটি চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। সেই লক্ষ্যে ইউএসএআইডির আর্থিক সহায়তায় ২০০৬ সালে নিসর্গ প্রকল্প চালু করে। এই প্রকল্প বন রক্ষায় নতুন আশার আলো দেখালে সরকার ২০০৯ সালের ২৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশে সহব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করে। এই পদ্ধতিকে সহায়তা দেয় ইউএসএআইডির সহায়তা প্রকল্প ইন্টিগ্রেটেড প্রটেকটেড এরিয়া কো-ম্যানেজমেন্ট (আইপ্যাক)। আইপ্যাকের মেয়াদ শেষ হলে ২০১৪ সাল থেকে পাঁচ বছরের জন্য কাজ শুরু করে ইউএসএআইডির আর্থিক সহায়তায় ক্লাইমেট রিসাইলেন্ট ইকোসিস্টেম লাইভলিহুড (ক্রেল) প্রকল্প।

রেমা-কালেঙ্গার দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্রেল কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম জানান, এই বনে প্রাণীদের খাদ্যসংকট আছে। অনেক আগে বন ও প্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস করা হয়েছে। এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি গাছ চুরি। বন ও প্রাণীদের রক্ষা করতে হলে অ্যাসিস্ট নেচারাল রিজেনারেশন (যেখানে বন শূন্য হয়েছে, সেখানে প্রাকৃতিকভাবে বন গড়ে তোলা) করতে হবে। তাহলে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ হবে। তাদের খাদ্যসংকট দূর হবে।

কালেঙ্গার দায়িত্বপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা চন্দন ভৌমিক জানান, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষার জন্য সরকারিভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জনগণের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। গাছ চুরির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একসময় ২০০-৩০০ লোক একসঙ্গে বনে ঢুকে গাছ চুরি করত। এখন আর সেটা হয় না। এখন বিক্ষিপ্তভাবে দু-চারজন গাছ চুরি করে। তবে চেষ্টা করা হচ্ছে, এই চুরিও যাতে বন্ধ হয়।’

উল্লেখ্য, রেমা-কালেঙ্গা বনে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১৬৭ প্রজাতির পাখি, সাত প্রজাতির উভচর, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৬৩৮ প্রজাতির গাছপালা ও লতাগুল্ম রয়েছে। এ বনে রয়েছে শতবর্ষী গর্জন, চাপালিশ, বনক, জারুল, আওয়াল, হারগাজা, বেলু, বট, শেওড়া, ডুমুর, গামার, বৈলাম, বনমালী ও শাল। সঙ্গে রয়েছে সেগুন, আগর, বহেড়া, কাঁঠাল, আমলকী, হরীতকী, ডেউয়া ও চালিতা। রিসাস বানর, কুলু বানর, লাজুক বানর, চশমাপরা হনুমান, লালচে হনুমানের দেখা মেলে। আছে বিপন্ন পাখি লালমাথা ট্রগন, রাজ ধনেশ ও রাজ ঘুঘু। বিপন্ন স্তন্যপায়ীদের মধ্যে কাঁকড়াখেকো বেজি, উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি, মালয়ান কাঠবিড়ালি ও রামকোটা কাঠবিড়ালি দেখা যায়।



মন্তব্য