kalerkantho

ঠাকুরগাঁও

জাদুঘরে লোকজীবন

পার্থ সারথী দাস, ঠাকুরগাঁও   

৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



জাদুঘরে লোকজীবন

ঠাকুরগাঁওয়ের ‘লোকায়ন জীবন বৈচিত্র্যময় জাদুঘর’ ইতিমধ্যে সাড়া ফেলেছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা শহরের পাশেই লোকজীবনযাত্রা নিয়ে ‘লোকায়ন জীবন বৈচিত্র্যময় জাদুঘর’ গড়ে তোলা হয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের শত শত নদীর জল বোতল ভর্তি করে এখানে সংরক্ষিত আছে। গ্রামবাংলার খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন আসবাব, প্রাচীন মুদ্রা, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার করা সরঞ্জামাদি এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত নানা উপকরণ থরে থরে সাজানো রয়েছে। ঠাকুরগাঁওসহ আশপাশের জেলার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জাদুঘরটি পরিদর্শন করতে প্রতিদিন ভিড় করছে।

স্থানীয় ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান প্রায় সাড়ে চার বছর আগে সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নে ১৭ একর জমির ওপর জাদুঘরটি স্থাপন করেছেন। এর নাম দিয়েছেন ‘লোকায়ন জীবন বৈচিত্র্যময় জাদুঘর’।

জাদুঘরে সাধারণত রাজা-বাদশাহদের জীবনযাপনের উপকরণ শোভা পেলেও  লোকায়ন একেবারেই ব্যতিক্রম। এখানে রাজাদের  বীরত্বের ইতিহাসের থেকে মানুষের রক্ত-ঘামে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যই বেশি স্থান পেয়েছে। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে নদী থেকে মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ।

এ ছাড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে বিলুপ্তপ্রায় কৃষি যন্ত্রপাতি, ডাল ভাঙার জাঁতা, ঢেঁকি, ছাম-গাইন, দড়ি পাকানোর ঢ্যারা, হুঁকা, চেরাগ, কুপি, বাদ্যযন্ত্র, পালকি, চিঠিপত্র, খাজনা আদায় রসিদ, গরুরগাড়ি, তীর-ধনুক-বল্লম প্রভৃতি।

শুধু শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা ও সংগ্রামের ইতিহাস উপস্থাপন নয়, কৃষি ও কৃষকের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত বর্ষামঙ্গল, নবান্ন, পিঠা উৎসবের মতো নানা অনুষ্ঠান এখানে নিয়মিত উদ্যাপন করা হয়। এসব উৎসবে স্থানীয় লোকনাট্য ধামের গান, কবিগান, গীত, আদিবাসী গান-নাচ পরিবেশন করা হয়। উৎসবে যোগ দেওয়া অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয় কলাপাতা ও মাটির তৈরি থালা, বাটি ও গ্লাসে। এখানে এলে জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের শিকড়ের অনেক কিছুরই সন্ধান মিলবে। আর তাইতো প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী এ জাদুঘরে ছুটে আসছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জাদুঘরটি খোলা থাকে।

লোকায়ণে আসা পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া দর্শনার্থী শিউলি আক্তার জানায়, সে স্কুলের সহপাঠীদের কাছে জাদুঘরটির কথা শুনে দেখতে এসেছে। এখানে প্রাচীন যুগের যেসব মুদ্রা রয়েছে, তা আগে কখনো দেখেনি। এখানে এসে এসব মুদ্রা দেখে সে মুগ্ধ হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী রোখসানা জানায়, সে পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের অনেক গল্প পড়েছে। কিন্তু এখানে এসে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার করা বন্দুক, গুলি, দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র, রেডিও, হেলমেট ও পোশাক দেখতে পায়।

পরিবারের স্ত্রী, সন্তান ও মা-বাবাকে নিয়ে আসা মাহবুব আলম নামের এক দর্শনার্থী বলেন, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমাসহ ছোট-বড় অনেক নদ-নদীর নাম শুনেছেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে এত সব নদী কখনো দেখা হয়নি। এ জাদুঘরের নদী গ্যালারিতে এসে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর নাম ও সেসব নদীর সংরক্ষিত পানি দেখতে পেয়ে অভিভূত হয়েছেন।

ঠাকুরগাঁও ইএসডিও স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক সেলিমা আক্তার জানান, লোকায়ন জীবন বৈচিত্র্যময় জাদুঘরে সবার জন্য শিক্ষণীয় বিষয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে প্রাকৃতিক ও কোলাহলমুক্ত মনোরম পরিবেশে খেলাধুলার বিভিন্ন উপকরণ। এ চত্বরের প্রতিটি গাছে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, যা সহজে অন্য কোথাও দেখা যায় না। এখানকার শান্ত পরিবেশের কারণে এসব পাখি নিজেরাই এসে বাসা বেঁধেছে। শুধু তা-ই নয়, জাদুঘরে বেড়াতে আসা শিশুদের বিনোদনের জন্য স্থাপন করা হয়েছে দোলনা, চড়কি, ঢেঁকিসহ নানা ধরনের খেলনা। প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে লোকায়ণের উদ্যোক্তা ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান নিজেই বেড়াতে আসা বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এ অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংগ্রামের কথা উপস্থাপন করেন। পাশাপাশি প্রদর্শন করা হয় শিশুতোষ চলচ্চিত্র।

এ জাদুঘরের উদ্যোক্তা ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান বলেন, লোকজ, সংস্কৃতি ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা ও সংগ্রামে ব্যবহৃত বিচিত্র সব উপকরণ এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তাই এর নামকরণ হয়েছে ‘লোকায়ন জীবন বৈচিত্র্যময় জাদুঘর’। সংগ্রামী সব মানুষের জীবন-জীবিকার কথা স্মরণে রাখতেই লোকায়ণের এ প্রচেষ্টা। লোকায়ণে এ অঞ্চলের ঐতিহ্য ও গৌরবকে সমন্বয় করার চেষ্টা করা হয়েছে, যা এলাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেবে।

লোকায়ন জাদুঘরের প্রশংসা করে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল জানান, জাদুঘরটি শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, সমগ্র দেশের মধ্যে একটি বিশেষত্ব বহন করছে। বাংলাদেশের অন্য কোথাও এমন বৈচিত্র্যময় জাদুঘর নেই। এর সঙ্গে এ অঞ্চলের মাটি ও মানুষের একটি মেলবন্ধন রয়েছে। জাদুঘরটির সঙ্গে সারা দেশের মানুষ পরিচিত নয়। তাই জাদুঘরটিকে জাতীয়ভাবে পরিচিত করতে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।

এ জাদুঘরের চারদিকে গাছগাছালিতে ঘেরা বিশাল চত্বরে রয়েছে ৭০ প্রজাতির ফল ও ১২০ প্রজাতির ঔষধি গাছ। গাছগাছালির ফাঁকে ফাঁকে দর্শনার্থীদের বসার জন্য রয়েছে বাঁশ দিয়ে তৈরি মাচা ও গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি চেয়ার-টেবিল। গ্রামীণ পরিবেশ ও পাখপাখালির আপ্যায়নের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। এখানে এলে পাখির কলকাকলি মনকে আরো প্রাণবন্ত করে তোলে।

 


মন্তব্য