kalerkantho


নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস

‘চ্যানেল’ ধরলেই পাসপোর্ট

মনিরুজ্জামান, নরসিংদী   

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



‘চ্যানেল’ ধরলেই পাসপোর্ট

নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দালালদের বলা হয় ‘চ্যানেল’। কেউ যদি এই চ্যানেলে না আসে তাহলে পড়তে হয় যত বিপত্তিতে। এই বিপত্তিতে জনকল্যাণমুখী এ অফিসটি সাধারণের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।

গত বুধবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শহরের বাইরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে দগরিয়া এলাকায় এর অবস্থান। মূল ফটকে একটি ফেস্টুন টাঙানো। এতে লেখা আছে ‘দালাল, প্রতারক থেকে সাবধান’। ফটকের ভেতরে প্রবেশ করলে নিরাপত্তাকক্ষে রাসেল নামের এক আনসার সদস্যের কাছে পাসপোর্ট করতে কয়েকজনের জটলা। ভেতরে কতগুলো চেয়ার পাতা রয়েছে। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত অবস্থান করে দেখা যায়, পাসপোর্ট করতে আসা লোকজনের নানা হয়রানির চিত্র।

আবেদনপত্র গ্রহণ কক্ষের সামনে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছেন মনোহরদী উপজেলার ব্রজের কান্দার এক স্কুল শিক্ষকের ছেলে মোহাম্মদ মাহফুজুল হাসান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি) বিভাগে স্নাতকোত্তর পড়ছেন। পাশাপাশি একটি নেটওয়ার্ক কম্পানিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘এখানে সেবার বদলে শুধু হয়রানি করা হয়। দালাল ছাড়া কোনো কাজ হয় না। দেখেন, অফিসের গেটে দালাল, ভেতরেও দালাল। আমি সব নিয়ম মেনে পাসপোর্টের ফরম পূরণ করে নিয়ে এসেছি; কিন্তু জমা নিচ্ছে না। আমার ফরমে দৈনিক আজকের খোঁজখবর পত্রিকার সম্পাদক ও নরসিংদী আইডিয়াল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনজিল এ মিল্লাতের সিলমহর, স্বাক্ষরসহ সত্যায়িত করানো। অফিস সহকারী সুজন বলেছেন, এটা হবে না।’

শিবপুরের নিনগাঁওয়ের নাবিল মোল্লা বলেন, ‘মঙ্গলবার আমি সারাদিন ঘুরেছি। কাগজপত্রও সব ঠিক ছিল; কিন্তু করতে পারিনি। আজ (বুধবার) শাহিন ভাইয়ের চ্যানেলে আসছি, কাজ হয়েছে।’

পরে মাহফুজুলকে পাসপোর্ট অফিসের মূল ফটকের পাশে মা টেলিকম নামের একটি ফটোকপির দোকানে শাহিনের কাছে নিয়ে যান নাবিল। সঙ্গে এই প্রতিবেদকও। সেখানে শাহিন বলেন, ‘পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ দুই হাজার ৫০০ আর পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়া এক হাজার ৫০০ টাকা। আর ছবি ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট করার তারিখ দেবেন ৪০০ টাকা। এই নাবিল ভাই ৪০০ টাকায় ৮ মার্চ তারিখ নিছে। আপনার কোনটা লাগবে?’ এসব শুনে মাহফুজুল ‘আমি নিজে নিজেই করব’ বলে স্থান ত্যাগ করেন। পরে দুপুর পৌনে ১টার দিকে মাহফুজুল ফের একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষের সিলস্বাক্ষরসহ নতুন সত্যায়িত করা ফরম নিয়ে আসেন। এই প্রতিবেদক মাহফুজুলের সঙ্গে যান। তখন দুপুর ১২টা ৫০ মিনিট। আবেদনপত্র গ্রহণের কক্ষে কাউকে না পেয়ে দোতলায় প্রশাসন কক্ষে যান তিনি। সেখানে অফিস সহকারী সুজনের কাছে ফরম নিয়ে গেলে তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ তিনি সাড়ে ১২টার পর ফরম জমা নেন না। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, পরদিন যাওয়ার জন্য। এ সময় সুজনের কক্ষে অবস্থান করা আরেকজন বলেন, ‘চ্যানেল ধরে আসেন।’ তখন মাহফুজুল কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) জেবুন্নাহার বেগমের কাছে যান। এডি সময়মতো না আসায় ফরম নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে অশালীন আচরণ করেন। তখন এই প্রতিবেদক পরিচয় গোপন করে কারণ জানতে চাইলে এডি বলেন, ‘আপনার কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে নাকি?’ এর মধ্যে সুজনের কক্ষে ঢোকেন হিসাব শাখার আরিফ নামের একজন। পরে সুজন ও আরিফ এই প্রতিবেদক ও মাহফুজুলকে উত্তেজিত হয়ে উচ্চ স্বরে ধমকাতে থাকেন। পরে এই প্রতিবেদক তাঁর পরিচয় দিলে জেবুন্নাহার শান্ত হয়ে অন্যদেরও চুপ করতে ইশারা দেন আর বলেন, ‘আপনার পরিচয়টা আগে দিলেও পারতেন।’ পরে তিনি সুজনকে মাহফুজুলের ফরম নিতে বলেন। আর যাবতীয় কার্যক্রম করে দিতে বলে চলে যান।

পরে ওই কার্যালয়ে আরো এক ঘণ্টা অবস্থান করে দেখা যায়, কয়েকজন তরুণ (দালাল) কয়েক দফায় সাত-আটটি করে পূরণ করা ফরম সুজনের কাছে জমা দিচ্ছে। তখন সুজনের কাছে জমা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি।

এ সময় কথা হয় পাসপোর্ট অফিসে হয়রানির শিকার শহরের বিলাসদী ব্যাংক কলোনির ফজলুল করিম মামুন, মনোহরদীর সর্বলক্ষণার ওমর ফারুক নামের দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে। ওমর ফারুক বলে, ‘আমার জাতীয় পরিচয়পত্র হয়নি। তাই ফরমের সঙ্গে জন্ম নিবন্ধনের সত্যায়িত ফটোকপি ও ইউনিয়ন পরিষদের নাগরিকত্ব সনদ জমা দিয়েছি। তখন এই সুজন তা জমা নেয়নি। বলে, জন্মনিবন্ধন নাকি অনলাইনে আপলোড হয়নি। পরে আপলোডের প্রমাণপত্র নিয়ে গেলে বলে, তুমি যে ছাত্র তার জন্য মূল সনদপত্র নিয়ে আসো, পরিচয়পত্র চলবে না। পরদিন তা নিয়ে গেলে বলে, ফরমে লেখায় কাটাকাটি হয়েছে, তা চলবে না। পরদিন আবার নতুনভাবে ফরম পূরণ করে নিয়ে গেলে বলে, তুমি তিন দিন আগে টাকা জমা দিছ। আবার নতুন করে টাকা জমা দিয়ে এসো।’ পরে একপ্রকার বাধ্য হয়ে এক দালালকে দুই হাজার টাকা দিয়ে ওই ফরম দিয়েই আবেদন করে। ওই দিন তা নিতে এসেছে। পরিচয় পাওয়ার পর এই প্রতিবেদকের সঙ্গে এ ব্যাপারে অভিযুক্ত কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি। তারা এডির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেয়। এডি দুপুরের খাবারের বিরতিতে থাকায় সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিসে যদি কেউ হয়রানির শিকার হয়ে তা নিয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ করে তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’



মন্তব্য