kalerkantho


ফাতেমাদের প্রতিবন্ধিত্ব জয়

আর অক্ষম নয় সক্ষম তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার (ঢাকা)   

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আর অক্ষম নয় সক্ষম তারা

ফাতেমা আক্তার

সাভারে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র সিআরপিতে কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে ফাতেমা আক্তারসহ ৬০০ প্রতিবন্ধী জীবনের নতুন লক্ষ্য খুঁজে পেয়েছে। বিভিন্ন পোশাক কারখানায় চাকরি করে তারা পর্যাপ্ত উপার্জন করছে। তারা এখন কারো বোঝা নয়। তাদের নিয়ে গতকাল বুধবার সিআরপির প্রধান কার্যালয় সাভারে দিনব্যাপী পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এ সময় আগের কথা স্মৃতিচারণা করে শেরপুর সদরের ফটিয়ামারী গ্রামের মরহুম আব্দুল কাদের ও মিনারা বেগমের মেয়ে ফাতেমা আক্তার (৩৮) বলেন, ‘মুখোমুখি বাস দুর্ঘটনায় ১৯৯৮ সালে গুরুতর আহত হই। এ ঘটনায় আমার ডান পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়। সেদিন মনে হয়েছিল, আমার বেঁচে থাকাটা অনর্থক। হাসপাতালে থাকতেই স্বামী আমাকে ডিভোর্স দেয়। হতাশ হয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে সত্মায়ের সংসারে ফিরে যাই। সংসারের বোঝা হয়ে থাকায় টানা আট বছর আমাকে নরক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। ২০০৬ সালে জানতে পারি, সাভারে সিআরপিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সিআরপিতে যোগাযোগ করে সুইংয়ের ওপর তিন মাসের একটি প্রশিক্ষণ নিই। পরে এখানকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাকে সুইং অপারেটর হিসেবে গাজীপুরের ইন্টারফ্যাব গার্মেন্টে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। পরবর্তী সময়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ আমার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর হিসেবে পদোন্নতি দিয়েছে। আমি আমার ছেলেটাকে ডাক্তারি পড়িয়েছি। মেয়েটা এখন মাস্টার্সে পড়ছে। এখন মনে হচ্ছে, একটি পা হারালেই জীবনটা শেষ হয়ে যায় না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অক্ষম নয়, তারাও সক্ষম। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, প্রচণ্ড পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও সমাজ থেকে একটু সুযোগ পাওয়ার ফলে শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও এখন আমি যথেষ্ট আয়-রোজগার করছি। এখন জীবনটাকে স্বার্থক বলে মনে হচ্ছে।’

সামাজিক প্রকল্প মার্কস অ্যান্ড স্টার্টের মাধ্যমে সিআরপিতে কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্তমানে দেশের ৭০টি পোশাক কারখানায় কর্মরত রয়েছে ৬০০ প্রতিবন্ধী কর্মী। তারা সবাই এ অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। ফাতেমার মতো তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে এক একটি সাফল্যের কাহিনি।

পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সারের কান্ট্রি ডিরেক্টর স্বপ্না ভৌমিকের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর সিআরপির ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের কো-অর্ডিনেটর রমেশ চন্দ্র হালদার প্রকল্পের কর্মকাণ্ডের ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন এফসিআই লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান মাহের মতিন, ইন্টারসফট অ্যাপারেলস লিমিটেডের পরিচালক নাঈমুল বাশার চৌধুরী, ফকরুদ্দিন টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ আশরাফ, এপিলিয়ন স্টাইল লিমিটেডের পরিচালক জুনায়েদ আবু সালেহ মুসা, স্প্যারো অ্যাপারেলস লিমিটেডের হেড অব অপারেশন কে জি সুব্রামানিয়াম ও তুসুকা ডেনিম লিমিটেডের পরিচালক মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) এ এম নাসিরুল আলম।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সারের সিনিয়র কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার মিজানুর রহমান, ট্রাস্ট ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজডের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান ও সিআরপির নির্বাহী পরিচালক শফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া কয়েকটি স্বনামধন্য পোশাক কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তাঁদের অভিজ্ঞতা ও উৎসাহমূলক বক্তব্য দেন। পরবর্তী সময়ে অতিথিরা সেরা কর্মচারী ও সেরা চাকরিদাতার হাতে পুরস্কার তুলে দেন। সিআরপির প্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়কারী ভ্যালেরি এ টেলরের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটির প্রথম পর্ব শেষ হয়।

ভ্যালেরি এ টেলর বলেন, ‘স্বপ্ন থাকতে হবে আকাশসম। তাহলেই আমরা পারব। কঠিন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও জীবন নিয়ে হতাশ হাওয়া যাবে না। জীবনযুদ্ধে হেরে না গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে যোগ্যতা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও যে পারে, তার উদাহরণ আজকের উপস্থিতি। এরা প্রত্যেকেই প্রতিবন্ধিত্ব জয় করতে পেরেছে। প্রতিবন্ধীদের সব বাধা দূর করতে সরকার ও সমাজের সব মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সারের কান্ট্রি ডিরেক্টর স্বপ্না ভৌমিক আরো জানান, মার্কস অ্যান্ড স্টার্ট বাংলাদেশের মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সারের একটি সামাজিক প্রকল্প। ২০০৬ সাল থেকে সিআরপি এ প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে।

এ প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত এক হাজার ৬০০ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ শেষে বিভিন্ন পোশাক কারখানায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।

 


মন্তব্য