kalerkantho


খোকন এখন ‘ট্রাফিক পুলিশ’

টঙ্গী (গাজীপুর) প্রতিনিধি   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



খোকন এখন ‘ট্রাফিক পুলিশ’

ট্রাফিকের কাজ করছেন খোকন। ছবি : কালের কণ্ঠ

খোকন। কথা বলতে পারেন না এই যুবক, স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারেন না। তাঁর ডান হাতও অকেজো। অথচ টঙ্গীর ব্যস্ততম ট্রাফিক সিগন্যালে ‘দায়িত্ব পালন’ করেন তিনি। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নিরলসভাবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কলেজ গেট ও সিটি কার্যালয় মোড়ে কাজ করতে দেখা যায় তাঁকে।  

খোকন ট্রাফিক পুলিশের কোনো সদস্য নন, মূলত টোকাই। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ট্রেন দুর্ঘটনায় হাত ও মাথায় আঘাত পান। এরপর কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ভিক্ষা করতে শুরু করেন। এর-ওর কাছে হাত পেতে চলছিল তাঁর সংসার। ২০০৯ সালে তৎকালীন টঙ্গী পৌর মেয়র ও বর্তমান গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খান তাঁকে রাস্তা থেকে ধরে এনে পৌরসভায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে চাকরি দেন। কিন্তু ঝাড়ু ফেলে খোকন হাতে নেন বাঁশের লাঠি। হঠাৎ একদিন পৌর ভবনের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ট্রাফিক পয়েন্টে লাঠি হাতে তাঁকে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায়। বিষয়টি অনেকের নজরে আসে। খোকনের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে পৌরসভা থেকে তাঁকে ট্রাফিক পুলিশের প্রচলিত ইউনিফর্ম বানিয়ে দেওয়া হয়। টঙ্গীর কলেজ গেট ও সিটি কার্যালয় মোড় ব্যস্ততম ট্রাফিক পয়েন্ট। আর এই পয়েন্ট দিয়ে অন্তত ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ প্রতিদিন ২০ হাজার মানুষ পার হয়।

টঙ্গী পাইলট স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী ইরাম রওশন অরনা বলে, “খোকন স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের দেখলেই যত্ন নিয়ে রাস্তা পারাপার করিয়ে দেন। তাঁর ‘ট্রাফিক পুলিশের’ পুরস্কার পাওয়া উচিত।” অন্যদিকে টঙ্গী সরকারি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আনোয়ারুল আজিম বলেন, ‘খোকন সবার কাছে পরিচিত। ছোট বাচ্চাদের রাস্তা পার হতে তিনি সাহায্য করেন। ছুটির পর ছোট বাচ্চারা এলে তিনি বীরদর্পে রাস্তার মাঝে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে গাড়ি থামিয়ে দেন। বাচ্চাদের মা-বাবারা তাঁকে খুব পছন্দ করে।’

টঙ্গী-গাজীপুর ট্রাফিক জোনের পরিদর্শক সোহরাব হোসেন বলেন, ‘সে (খোকন) আমাদের কোনো সদস্য নয়। সিটি করপোরেশনের লোক। তার কাজ পথচারীদের রাস্তা পারাপারে সহায়তা করা। অবশ্যই এটা ভালো কাজ।’

টঙ্গী কমিউনিটি পুলিশের সদস্য এলাছ মিয়া ও আব্দুল হক বলেন, ‘খোকন আমাদের সহকর্মী। তার ডিউটি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। কিন্তু সে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করে। তার দায়িত্বশীলতা ও সততা আমাদের আশ্চার্যান্বিত করে।’

খোকনের বাবা গাজীপুর সদরের হায়দরাবাদ গ্রামের ইউসুফ আলী। কারখানায় অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘খোকন বাড়ি থেকে প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত করত। হঠাৎ একদিন চলন্ত ট্রেনের ধাক্কা খেয়ে সে গুরুতর আহত হয়। আমরা মনে করেছিলাম সে আর বাঁচবে না। আর এখন মানুষের সেবা করা তার কাজ। এই কাজ করে সে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছে। সিটি করপোরেশন থেকে মাসিক ৯ হাজার টাকা বেতন পেয়ে সে আমাদের সংসার চালায়। প্রায়ই অনেকে খুশি হয়ে তার হাতে উপহার তুলে দেয়।’

আওয়ামী লীগ নেতা আজমত উল্লাহ খান বলেন, ‘খোকন ঝুঁকি নিয়ে রাতের আঁধারেও কাজ করে। সে প্রমাণ করেছে, অদম্য ইচ্ছা থাকলে মানুষ তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ অনেক কঠিন কাজ। এই কঠিনকে সে সহজ করতে পেরেছে।’ 

 



মন্তব্য