kalerkantho

মনির যাত্রা...

নওগাঁ প্রতিনিধি   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মনির যাত্রা...

শারমিন আখতার মনি

বাল্যবিয়ের শিকার শারমিন আখতার মনি পড়ালেখা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। হতে চেয়েছিলেন স্বাবলম্বী; কিন্তু তা ‘পছন্দ’ হয়নি স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের। একপর্যায়ে মনিকে তালাক দেওয়া হয়। তবু থেমে থাকেননি। নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে এগিয়ে গেছেন সামনে। নিজের ইচ্ছা-আগ্রহ অনুযায়ী নিয়েছেন উচ্চশিক্ষা।

নওগাঁর নিয়ামতপুরের বাহাদুরপুর ইউনিয়নের রামগাঁয়ের সাহার আলী ও নাদিরা বেগম দম্পতির বড় সন্তান মনি। ২০০৯ সালে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের পর মা-বাবা তাঁকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাল্যবিয়ে দেন। একই উপজেলার শ্রীমন্তপুর ইউনিয়নের চুনিয়াপাড়ার মাসুদ ইকবালের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। বিয়ের পরও পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন মনি; কিন্তু স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাতে অসম্মতি জানায়। এসএসসি পরীক্ষার দুই দিন আগে স্বামীর বাড়ি থেকে পালিয়ে যান মনি। পরে পরীক্ষায় অংশ নেন। জিপিএ-৩.৭৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। শ্বশুরপক্ষের বাধা অতিক্রম করে রাজশাহীর তানোরের তালন্দ আনন্দ মোহন ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। একপর্যায়ে মনিকে তালাক দেন মাসুদ। তবু দমে যাননি মনি। ২০১১ সালে জিপিএ ৪.০০ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। একই কলেজ থেকে বিএসসিতে ৯৪৭ নম্বর পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। পরে রাজশাহী কলেজ থেকে প্রাণিবিদ্যায় প্রিভিয়াস করেন। এখন পড়ছেন মাস্টার্স শেষ বর্ষে। পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজে (টিচার্স ট্রেনিং কলেজ) এক বছরের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এর মধ্যে শেষ করেছেন বিএডও। অপেক্ষায় আছেন ফলাফলের।

বিভীষিকাময় জীবনের কাহিনী বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন মনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা দুই বোন, এক ভাই। আমি সবার বড়। একমাত্র ভাই প্রতিবন্ধী। ছোট বোন এইচএসসি দেবে। আমার মা-বাবা গরিব পরিবার বলে এসএসসির প্রস্তুতি নেওয়ার সময় আমাকে হঠাৎ বিয়ে দিয়ে দেন। এর আগে পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছিলাম আমি। ইচ্ছা ছিল পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার। বারবার স্বামীকে বললেও তিনি কোনোভাবেই আমাকে পড়ালেখার অনুমতি দেননি। নিরুপায় হয়ে পরীক্ষার দুই দিন আগে গোপনে স্বামীর বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে এসএসসি দিই। এ নিয়ে আমার বিরুদ্ধে অনেক বিচার-সালিসও করেছেন স্বামী; কিন্তু আমার জেদ ছিল পড়ালেখা করার। শুরু হয় আমার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। তবুও নিজের ইচ্ছাতে অনড় থাকি। অবশেষে স্বামী আমাকে তালাক দেন। তাতেও ভেঙে পড়িনি।’

মনি বলেন, ‘আমি দেশের ও সমাজের বোঝা হয়ে থাকতে চাই না, সম্পদ হতে চাই।’


মন্তব্য