kalerkantho


দোহারের নুরুল্লাহপুর মেলা, মঞ্চ পাহারায় পুলিশ

যত বেশি টাকা ততটাই নগ্নতা

দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



যত বেশি টাকা ততটাই নগ্নতা

রাত ২টা। দোহার উপজেলার নুরুল্লাহপুর মেলা প্রাঙ্গণের শেষ অংশে পাশাপাশি তিনটি প্যান্ডেল। এক পাশে সার্কাস, আরেক পাশে ভ্যারাইটি শো ও জাদু প্রদর্শনের আলাদা তিনটি মঞ্চ। এই তিন মঞ্চ ঘিরেই মানুষের ঢল। মঞ্চগুলোর প্রবেশমুখে লম্বা লাইন। সবার হাতে ১০০ বা ২০০ টাকার টিকিট। মঞ্চের চারপাশে পাঁচ-ছয়জন পুলিশ সদস্যের অবস্থান। টিকিট কেটে গোপন ক্যামেরা সঙ্গী করে এই প্রতিবেদক তিনটি আয়োজনের মঞ্চের কাছে গেলেন। মঞ্চগুলোর মাইকে আয়োজকদের একই ঘোষণা, ‘মোবাইলে কেউ ভিডিও বা ছবি তুললে তার মোবাইল নিয়ে নেওয়া হবে।’ এরপর শুরু হলো স্বল্পবসনা তরুণীদের নাচ। প্রতি শোর শেষ অংশে নাচতে নাচতে প্রায় অর্ধনগ্ন হয়ে যান তরুণীরা। আর তরুণীদের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সামনের সারির দর্শকরা। নাচের তালে তালে উড়তে থাকে টাকা। যত বেশি টাকা তত বেশি নগ্নতা।

আবার নাচতে আসা শিল্পীদের সাজঘরে (গ্রিনরুম) নিয়ে যাওয়া হয় বেশি আগ্রহী দর্শকদের। সেখানে বেশি টাকায় চলে অসামাজিক কার্যকলাপ। তিন মঞ্চে ‘শো’ চলাকালে ভেতরেও পুলিশকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। মঞ্চের চারপাশ ঘিরেই আয়োজকদের কড়া পাহারা। কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও বা ছবি তুলছে কি না, এটাই তারা ঘুরে ঘুরে দেখছে।

গত মঙ্গলবার রাত ১টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে এই চিত্র পাওয়া যায়।

প্রতি ভ্যারাইটি শোর নির্ধারিত সময় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। টিকিটের দাম ‘চেয়ার’ ২০০ টাকা আর ‘বাংলার মাটি’ (দাঁড়িয়ে বা বসে দেখা) ১০০ টাকা। সার্কাসে (আয়োজনের বেশি অংশে দেখানো হয় নাচের নামে অশ্লীলতা) ১ ঘণ্টার প্রদর্শনীতে টিকিটের মূল্য ‘চেয়ার’ ১৫০ আর ‘বাংলার মাটি’ ১০০ টাকা। মেলায় রাতভর ১০-১২টি জুয়া আর গাঁজার আসরও বসে।

এই আয়োজনের পাশেই হয় ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী নুরুল্লাহপুর ফকিরবাড়ির ওরস। জানা যায়, প্রতিবছর এই ওরসকে কেন্দ্র করে বসে মেলা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, অন্তত সাত দিন সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত চলবে ওই ভ্যারাইটি শো। মেলা এলাকার অনেক কিশোর ও যুবক এই আয়োজনে সম্পৃক্ত। আয়োজন ঘিরে মেলা প্রাঙ্গণে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে; কিন্তু সব জেনেও প্রশাসন কার্যত কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টির এমন আয়োজনের জন্য ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যেও। বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে তারা এর প্রতিবাদ জানাচ্ছে। গত বছর মেলায় এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা, মামলা পর্যন্ত হয়েছে। তার পরও প্রশাসন এবার আগেভাগে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবি জানায় বিক্ষুব্ধরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দোহার উপজেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক আকতার হোসেন, তাঁর বাবা সিরজন মোল্লা ও কুসুমহাটি ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক মামুন খাঁ ভ্যারাইটি শো ও সার্কাস পরিচালনা করছেন। অন্তরালে আছেন রাজনৈতিক নামধারী বেশ কিছু কর্তাব্যক্তি।

তবে আকতার হোসেন বলেন, ‘আমি সার্কাসের সঙ্গে জড়িত। ভ্যারাইটি শো কারা করছে আমার জানা নেই।’ মামুন খাঁ বলেন, ‘ভ্যারাইটি শোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কারা এটা করছে তাও জানা নেই। থানা-পুলিশ ভালো বলতে পারবে।’ এ বিষয়ে সিরজন মোল্লার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দোহার থানার পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মেলাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ মেনে নেওয়া হবে না। কেউ অশ্লীল কোনো আয়োজনের চেষ্টা করলে অভিযান চালিয়ে সব ভেঙে দেওয়া হবে।’

দোহার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বা এর কোনো অঙ্গসংগঠন এ ধরনের অশ্লীল আয়োজনে সম্পৃক্ত নয়। যদি কেউ থেকে থাকে তাদের দায়ভার দল নেবে না। আমি র‌্যাব ও পুলিশকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়েছি। অশ্লীল কোনো আয়োজন করা হলে, তা শক্ত হাতে দমন করা হবে।’

উল্লেখ্য, প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান এমনকি বিদেশ থেকে হাজারও ভক্তের সমাগম ঘটে নুরুল্লাহপুর দরবার শরিফের ওরসে। মঙ্গলবার রাতে ধামাইলের মাধ্যমে ওরস হয়। ওরস ঘিরে মেলা চলবে অন্তত ১৫ দিন।


মন্তব্য