kalerkantho


হাওরে পানি নামছে না বোরো আবাদ সংকটে

হাফিজুর রহমান চয়ন, হাওরাঞ্চল   

২৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের চারা রোপণের সময় শেষ হয়ে এলেও পানি না কমায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের বেশির ভাগ বোরো জমিতে চারা রোপণ করতে পারেননি কৃষকরা। হাওরের পানি যথাসময়ে না কমায় অনেকের বোরো ধানের চারা বীজতলায়ই নষ্ট হচ্ছে।

গত শনি ও রবিবার নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা হাওর, খালিয়াজুরীর চুনাই, চৌতারা হাওর; সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার ধারাম, ডুবাইল, মারাধাইরিয়া, কাইলানি হাওর ও জামালগঞ্জের পাকনার হাওর এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এসব সমস্যার কথা জানা গেছে।

কৃষকরা জানান, গত বছর আগাম বন্যায় হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ায় তাঁদের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। গত বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবার তাঁরা পুরাতন ঋণের সঙ্গে নতুন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বোরো জমি আবাদ করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। সঠিকভাবে চাষাবাদ করতে কেউ কেউ গরু-ছাগল বিক্রির পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চড়া সুদে ঋণও নিয়েছেন। প্রতিবছর পৌষ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই হাওরের জমিতে বোরো ধানের চারা রোপণ শুরু হয়। আর মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহে তা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এবার বোরো আবাদের সময় শেষ হয়ে এলেও বেশির ভাগ জমিতে চারা রোপণ করা সম্ভব হয়নি। বীজতলায় ধানের চারার বয়স বেশি হওয়ায় তা বিবর্ণ আকার ধারণ করে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষকরা এখন কী করবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না।

কয়েকজন কৃষক জানান, হাওরের পানি নিষ্কাশনের নালা ও সংশ্লিষ্ট সব কটি নদী খননের অভাবে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি দ্রুত কমছে না। এ পরিস্থিতিতে হাওরের নিষ্কাশন নালা ও নদী খনন করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকায় অবস্থানরত বিশিষ্ট কৃষিবিজ্ঞানী এবং হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. সদরুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাওর এলাকার কৃষকদের নতুন এ সমস্যা দূর করতে হলে প্রথম ধাপেই জরুরিভিত্তিতে পানি নিষ্কাশনের নালার মুখগুলো খনন করতে হবে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’

মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা হাওর পাড়ের তেথুলিয়া পূর্বপাড়া গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম (৫০) বলেন, ‘ডিঙ্গাপোতার মহিষাউড়া আওরে (হাওরে) আমার সাত একর জমি হতি বছরই পৌষ মাসের পনেরর মধ্যে রুয়ার কাম শেষ অইয়া যায়। ইবার খেত রুয়ার ঘাত (সময়) যাইতাছেগা। এর পরও কোনো কোনো খেতের মাঝে অহনও হাঁটু বা কোমর পানি থাকায় এক কাটাও খেত লাগাইতাম পারছি না। এইবার খোদা যে, আমরারে নতুন কইরা কোন বিপদে হালাইছে কিছুই বুঝতাছি না।’

ধর্মপাশা উপজেলার কাইলানী হাওর পারের শাহপুর গ্রামের প্রভাবশালী কৃষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘গত বছরের আড়াই লাখের সঙ্গে এবারের তিন লাখ টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কাইলানী হাওরে ৬০ একর বোরো জমি আবাদ করার প্রস্তুতি নিয়েছি। ইতিমধ্যে হাওরের উঁচু এলাকার ১৬ একরের মতো বোরো জমিতে রোপণের কাজ শেষ করেছি। বাকি জমিতে কোমর পানি থাকায় রোপণ করা সম্ভব হয়নি। সময়মতো জমিতে চারা রোপণ করতে না পারায় সেগুলো বীজতলাতে লালচে রং ধারণ করে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই আমরা চরম বিপদের মধ্যে আছি।’

 জামালগঞ্জ উপজেলার পাকনার হাওর পাড়ের ফেনারবাগ গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কৃষক সাজেদুর রহমান জানান, তিনি প্রতিবছর পৌষ মাসের শেষের দিকে জমি রোপণের কাজ শেষ করতেন। এবার জমিতে এখনো হাঁটুর ওপরে পানি থাকায় ঘোর বিপদের মধ্যে আছেন।

ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শোয়েব আহমেদ কালের কণ্ঠকে জানান, ‘এবার এ উপজেলায় ৩১ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এ পর্যন্ত কৃষকরা ১৬ হাজার হেক্টরের মতো জমিতে রোপণের কাজ শেষ করতে পেরেছেন। তবে আগামী ১৫-১৬ দিনের মধ্যে হাওরের নিচু এলাকার জমিগুলোতেও কৃষকরা রোপণের কাজ শেষ করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস।’


মন্তব্য