kalerkantho


রাঙামাটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

পুনর্নিয়োগে তদবির বিতর্কিত উপাচার্যের

ঠেকাতে কঠোর সংগ্রাম পরিষদ

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পুনর্নিয়োগে তদবির বিতর্কিত উপাচার্যের

একই সঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিল রাঙামাটি মেডিক্যাল কলেজ এবং রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। চার বছর পর মেডিক্যাল কলেজে ১৫০ শিক্ষার্থীর জন্য ৬০ জন শিক্ষক, নিজস্ব হোস্টেলে প্রতি কক্ষে দুজন করে শিক্ষার্থী থাকার ব্যবস্থা, ফলাফলও ঈর্ষণীয়।

অথচ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বিভাগে তিন ব্যাচের ৩০০ শিক্ষার্থীর জন্য আটজন শিক্ষক। নিজস্ব কোনো ক্যাম্পাস নেই, ক্লাস হচ্ছে একটি বেসরকারি স্কুলের দুটি শ্রেণিকক্ষে, স্কুলের শিক্ষকের কোয়ার্টারের এক কক্ষে গাদাগাদি করে থাকছে ১০ জনের বেশি শিক্ষার্থী। কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগ থাকলেও নেই কোনো ল্যাব, লাইব্রেরি তো দূরের কথা।

উপাচার্যের অযোগ্যতা, ব্যর্থতার কারণেই প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরুর চার বছর পরও প্রতিষ্ঠানটি একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। নানা অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই গত ১২ জানুয়ারি শেষ হয় উপাচার্য ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমার মেয়াদ।

উপাচার্য প্রদানেন্দু পুনর্নিয়োগ পেতে তদবির করছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। কয়েকজন স্থানীয় রাজনীতিককে দিয়ে তদবিরের জন্য উপাচার্য প্রদানেন্দু কয়েক দিন ধরে রাজধানীতে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে উপাচার্য প্রদানেন্দুর পুনর্নিয়োগ ঠেকাতে মাঠে নেমেছে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ, পার্বত্য নাগরিক পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠন।

ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমাকে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হলে পরদিন থেকেই অনির্দিষ্টকালের হরতাল পালনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ। গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন থেকে এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ রাঙামাটি জেলা শাখার আহ্বায়ক মো. জাহাঙ্গীর আলমের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন নাগরিক পরিষদের সভাপতি নুরজাহান বেগম। বিশেষ অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবছারউদ্দিন, বাঙালি ছাত্র পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব।

এর আগে এই উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিক্যাল কলেজ বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ। তারা এই উপাচার্য পুনর্নিয়োগ পেলে লাগাতার হরতালের ঘোষণা দিয়েছে।

শিক্ষার্থীরা জানায়, এত বছরেও শহরের শাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের দুটি শ্রেণিকক্ষে চলছে দুটি বিভাগের (কম্পিউটার সায়েন্স এবং ব্যবস্থাপনা) তিনটি ব্যাচের ক্লাস। এর পাশেই স্কুল শিক্ষকদের কোয়ার্টারে অস্থায়ী ছাত্রাবাসে থাকছে দেড়শতাধিক ছাত্র। আর বাসা ভাড়া নিয়ে চলছে ছাত্রী হোস্টেল।

আবার যেখানে ক্লাস হয়, সেখান থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে শহরের আরেক প্রান্তের ভেদভেদীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অব্যবহৃত একটি ভবনে চলছে একাডেমিক কার্যক্রম। কোনো একাডেমিক কাজে সেখানে যেতে-আসতে শিক্ষার্থীদের ভাড়া লাগে প্রতিবার ৬০ টাকা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমাকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ এর আগে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি কখনই বিভাগীয় চেয়ারম্যান কিংবা ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি। প্রথম বছর কোনো কার্যক্রমই শুরু করেননি তিনি। শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের দাবির মুখে সরকার ২০১৫ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের কার্যক্রম শুরু করে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কার্যক্রম শুরুর পর শিক্ষক ও কর্মচারী  নিয়োগে নিজের জেলা খাগড়াছড়ি থেকে একের পর এক নিয়োগ দিতে শুরু করেন উপাচার্য। সেই সঙ্গে নিজের আত্মীয়স্বজন এবং পার্বত্য জেলার প্রভাবশালী পরিবারের কিছু সদস্যকেও নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের মেধা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শিক্ষাজীবনে তৃতীয় শ্রেণি থাকা একাধিক প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এক পদের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অন্য পদে এবং এর আগে অব্যাহতি পাওয়া কর্মকর্তাকেও নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় অর্ধশত শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকলেও তাঁদের মধ্যে উপাচার্য ছাড়া আর কারোরই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চাকরি কিংবা কাজের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই।

আবার শিক্ষার্থী ভর্তিতেও উপাচার্য অযোগ্যদের আলাদাভাবে পরীক্ষা নিয়ে ভর্তির সুযোগ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন কেউ কেউ।

নতুন অভিযোগ : বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকলেও নতুন করে আরো সাতটি বিভাগ চালু ও জনবল নিয়োগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে আবেদন জমা দিয়েছেন উপাচার্য। নিজের লোকজন ব্যাপকভাবে নিয়োগ দিতেই তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেন, ‘যদি এই বিতর্কিত, ব্যর্থ ও অযোগ্য ভিসিকে আবার নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে টানা হরতালসহ কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে পার্বত্য রাঙামাটি অচল করে দেওয়া হবে। তাঁর জায়গায় যোগ্য এবং অভিজ্ঞ যে কাউকেই ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিলে আপত্তি নেই আমাদের।’

তবে নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে উপাচার্য ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমা বলেছেন, ‘অভিযোগ যে কেউ করতেই পারে, অভিযোগ করলেই সব সত্যি হয়ে যায় না। আমি নিয়ম মেনেই সব করেছি। যারা আন্দোলন করছে আমি তাদের সঙ্গে কথা বলারও চেষ্টা করেছি।’

মেয়াদ বাড়ানোর জন্য তদবিরের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত কাজে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। মেয়াদ বাড়ানো না বাড়ানো সরকারের বিষয়।



মন্তব্য