kalerkantho


জয়পুরহাট আওয়ামী লীগ

ছাইচাপা দ্বন্দ্বের অশান্ত রূপ

জয়পুরহাট প্রতিনিধি   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ছাইচাপা দ্বন্দ্বের অশান্ত রূপ

জয়পুরহাট জেলা আওয়ামী লীগের তিন নেতাকে বহিষ্কারের প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে কালাই উপজেলা সদরের প্রধান সড়কে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা ঝাড়ু মিছিল বের করে। ছবি : কালের কণ্ঠ

জয়পুরহাট জেলা আওয়ামী লীগের গোপন কোন্দল প্রকাশ পায় ২০১৬ সালে। এত দিন উভয় পক্ষ শান্ত হয়ে আলাদা কর্মসূচি পালন করছিল। কোনো সমস্যা হয়নি। সেই আপাত শান্ত কোন্দলের অশান্ত রূপ শনি ও রবিবার প্রত্যক্ষ করেছে জেলাবাসী।

দলীয় সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ১২ ডিসেম্বর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে ৪৬ জন সদস্য অনাস্থা জ্ঞাপন করে। এরপর জেলা আওয়ামী লীগের কোন্দল দৃশ্যমান হয়। দলের বড় অংশ সঙ্গে না থাকলেও সভাপতি ও সম্পাদক অনুসারীদের নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও দলের কর্মসূচি পালন করেন। আর পৃথক ব্যানারে জেলা কমিটির বড় অংশ দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। পৃথক জনসভার আয়োজন করে তাঁরা একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদাগারও করেছেন। হঠাৎ করে গত শনিবার দলীয় কার্যালয়ে জরুরি সভা ডাকেন সভাপতি সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সামছুল আলম দুদু ও সাধারণ সম্পাদক এস এম সোলায়মান আলী। এতে তাঁদের অনুসারী জেলা কমিটির ১৭ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা জেলা কমিটির তিন নেতার বিরুদ্ধে পূর্বপুরুষ শান্তি কমিটির সদস্য ও স্বাধীনতাবিরোধী অভিযোগ আনেন। তাঁদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা হলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কালাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মিনফুজুর রহমান মিলন, সদস্য ও পুনট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুস ফকির এবং মাত্রাই ইউপি চেয়ারম্যান আ ন ম শওকত হাবিব লজিক।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে নেতাকর্মীরা। গতকাল দুপুরে কালাই উপজেলা সদরের প্রধান সড়কে হাজার হাজার নেতাকর্মী ঝাড়ু ও জুতা মিছিল করে। তারা দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করে। এতে বক্তব্য দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কালাই পৌর মেয়র হালিমুল আলম জন, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মিনফুজুর রহমান মিলন, ইউপি চেয়ারম্যান শওকত হাবিব লজিক, আব্দুল কুদ্দুস, আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল করিম, ফজলুর রহমান, ইউপি চেয়ারম্যান ওয়াজেদ পারভেজ, আলী আহম্মেদ প্রমুখ। পরে সেখানে সভাপতি ও সম্পাদকের কুশপুত্তলিকা দাহ করে তাঁদের কালাইয়ে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়।

বিকেলে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন কমিটির ৪৯ সদস্য। সেখানে বহিষ্কারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। পাশাপাশি জেলায় সভাপতি ও সম্পাদককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। নেতারা দাবি করেন, অব্যাহতি দেওয়া ওই তিন নেতা এবং তাঁদের পরিবার প্রায় দুই যুগ ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁরা উপজেলা ও ইউনিয়নে একাধিকবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান। অব্যাহতি দেওয়া কালাই উপজেলা পরিষদের পর পর দুবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান মিনফুজুর রহমান মিলন। তাঁর বাবা প্রয়াত মাহফুজার রহমান মন্টুও উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ছিলেন কৃষক লীগ নেতা। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা কালাই সফরে এলে ফুলের তোড়া দিয়ে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এরপর থেকে তাঁর নেতৃত্বে কালাইয়ে আওয়ামী লীগ সংগঠিত হয়। বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিগত জোট সরকারের সময় মন্টু ছিলেন সবচেয়ে নির্যাতিত নেতা। তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিয়ে এলাকাছাড়া করা হয়েছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময়। মন্টুর ছোট ভাই অব্যাহতি পাওয়া আব্দুল কুদ্দুস। আরেক অব্যাহতি পাওয়া শওকত হাবিব ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এলাকায় তিনি আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা হিসেবে পরিচিত। জনপ্রিয়তার কারণে তিনি দুবার ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

এই সংবাদ সম্মেলনে জেলা কমিটির সহসভাপতি সামছুল আলম মোল্লা, সরকারি কৌঁসুলি নৃপেন্দ্রনাথ মণ্ডল, গোলাম হক্কানী, যুগ্ম সম্পাদক জাকির হোসেন, জেলার পাঁচ পৌরসভার মেয়রসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মোমিন আহম্মেদ চৌধুরী বলেন, ‘সভাপতি ও সম্পাদক দলের জনপ্রিয় তিন নেতাকে যেভাবে বহিষ্কার করেছেন, এটা দল ও গঠনতন্ত্রবিরোধী। ওই তিন নেতা এলাকায় জনপ্রিয়। তাঁরা তিনজন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সংসদ সদস্য আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের মাধ্যমে এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের বহিষ্কার করার কারণ হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে স্বপনের ভোট কমানো। স্বপন যেন পাস করতে না পারেন, সেই এজেন্ডা তাঁরা বাস্তবায়ন করছেন।’ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জয়পুরহাট পৌর মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক বলেন, ‘আমরা বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করছি।’

আক্কেলপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র গোলাম মাহফুজ চৌধূরী বলেন, ‘দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে জেলা সভাপতি ও সম্পাদককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। দলের নামে আর কোনো ষড়যন্ত্র তাঁদের করতে দেওয়া হবে না।’

জেলা কমিটির সভাপতি সামছুল আলম দুদু বলেন, ‘দলের গঠনতন্ত্র মেনে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জেলা কমিটির তিন নেতাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তাঁদের স্থায়ীভাবে অব্যাহতির জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত হবে।’



মন্তব্য