kalerkantho


রিমি সাহার আনন্দাশ্রু

শামীম খান, মাগুরা   

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রিমি সাহার আনন্দাশ্রু

রিমি সাহা

বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশ পেয়েছে গত ৩১ ডিসেম্বর। এই পরীক্ষায় মাগুরা সদর উপজেলার জাগলা গ্রামের রিমি সাহা সারা দেশে মেধাতালিকায় প্রথম হয়েছেন। কিন্তু এতো ভালো ফল করেও তাঁর মনে আনন্দ নেই। গত ২৯ ডিসেম্বর রাতে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর বাবার মৃত্যু হয়েছে। তাঁর এই সাফল্যের খবর শুনলে সবচেয়ে খুশি হতেন তিনি।

রিমির বাবার নাম সমীর সাহা। তিনি ক্ষুদ্র পান ব্যবসায়ী। ঘটনার রাত সাড়ে ৯টার দিকে মাগুরা শহর থেকে জাগলামুখী একটি গ্রামবাংলা অটো টেম্পোকে যশোরমুখী বাস পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। আহত হন টেম্পোর ১৬ যাত্রী। তাঁদের দ্রুত মাগুরা সদর হাসপাতালে আনা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান পঞ্চাশোর্ধ্ব সমীর।

সমীরের মামা গুরুদাস সাহা বলেন, ‘সমীরের তিন সন্তানের প্রত্যেকে মেধাবী। এ কারণে মাগুরা শহরের ভায়না এলাকার ছোট্ট একটি পান দোকানে দিনরাত খেয়ে না খেয়ে পরিশ্রম করত ভাগ্নে। যেভাবে হোক সন্তানদের প্রত্যেকে বড় হয়ে পরিবার ও এলাকার মুখ উজ্জ্বল করবে, এটাই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। আর বাবার স্বপ্নপূরণে সন্তানরা ছিল মরিয়া। বড় মেয়ে রিমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে প্রথম শ্রেণিতে যেমন প্রথম হয়েছে, তেমনি জুডিশিয়াল নিয়োগেও প্রথম হয়েছে। বাকি দুই ছেলের মধ্যে সৌরভ সাহা রংপুর মেডিক্যাল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। সবার ছোট সুভ্র সাহা পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইটি বিভাগে। সন্তানদের এতটা সাফল্যের পেছনে যাঁর অবদান সেই বাবার এমন অকালমৃত্যু ভাবেনি কেউ।’

সমীরের এই মর্মান্তিক মৃত্যু ও রিমির সাফল্য সংবাদ নিয়ে গোটা জাগলা গ্রামে এখন চলছে আনন্দ-বিষাদের আলোচনা। সবার চোখেমুখে যেন একই অভিব্যক্তি। আর তা হচ্ছে, চরম বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার এই যুগে সামান্য আয়ের পান ব্যবসায়ী প্রমাণ করেছেন, কঠিন ব্রত থাকলে যত দারিদ্র্যই থাক সন্তানকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

রিমি সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাবার স্বপ্ন ছিল আমাদের তিন ভাই-বোনের প্রত্যেককে প্রতিষ্ঠিত দেখে যাওয়া। সে লক্ষ্যে বাবা পানের ছোট্ট একটি দোকানে দিনরাত শ্রম দিয়ে আমাদের লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন। আমরা তিন ভাই-বোনের প্রত্যেকে বাবার স্বপ্নপূরণে সব সময় সচেষ্ট থেকেছি। কিন্তু এমন একটা সময় বাবা চলে গেলেন, যখন আমাদের ঘিরে বাবার সব স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথে।’ তিনি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সবাইকে আরো সচেষ্ট হওয়ার অনুরোধ জানান। সেই সঙ্গে সবার সহযোগিতা চান।

কথা প্রসঙ্গে রিমি আরো বলেন, ‘আমাদের তিন ভাই-বোনের সাফল্যের মূলে রয়েছে ভালোবাসা ও বিশ্বাস। আমাদের প্রতি বাবা-মায়ের ভালোবাসা ও বিশ্বাস দুটোই সমানভাবে ছিল। একইভাবে তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালোবাসা ছিল একই রকম। জীবনে বড় হতে গেলে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালেবাসাটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’

রিমির ভাই রংপুর মেডিক্যাল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র সৌরভ সাহা বলেন, ‘অর্থাভাবে আমার বাবা এসএসসির ফরম পূরণ করতে পারেননি। এ কারণে তাঁর লেখাপড়া বেশিদূর এগোতে পারেনি। অথচ তাঁর সব সময় স্বপ্ন ছিল আমাদের মানুষের মতো মানুষ করবেন। তাঁর সে স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি কত কষ্টই না করেছেন। যখন সেই স্বপ্ন পূরণের পালা তখনই চলে গেলেন তিনি। বাবাকে সুখের মুখ দেখাতে না পারার এ যন্ত্রণা আমাদের আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হবে। এটা ভাবলে সব কিছু কেমন স্তব্ধ হয়ে আসে।’

এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে জাগলা এলাকার বাসিন্দা আয়ুব হোসেন জানান, মাগুরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের ১২ জেলার মহাসড়কে নসিমন-করিমনসহ অবৈধ সব শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যানবাহন চলাচলে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবু প্রতিদিন এ ধরনের হাজার হাজার অবৈধ যান চলছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। শুধু তা-ই নয়, এসব সড়কে চলাচলকারী দূরপাল্লার বাস-ট্রাকসহ অন্য যানগুলোর গতি অনেক বেশি থাকে। একই সঙ্গে চালকদের ওভারটেকিং প্রবণতা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আরো বাস্তবিক পদক্ষেপ দরকার।



মন্তব্য