kalerkantho


সাদেকুল লুটপাটে মশগুল

লিমন বাসার, বগুড়া   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সাদেকুল লুটপাটে মশগুল

বগুড়ার প্রথম বাইপাস মেরামতে গত বছর খরচ হয়েছে ৩৪ কোটি টাকা। অথচ সেই সড়কে কোথাও কোথাও গর্ত হয়েছে। চলছে আরো মেরামত। (ডানে) দ্বিতীয় বাইপাস মহাসড়কটি যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এই মহাসড়কে গর্ত গুনে শেষ করা যায়নি। সম্প্রতি এটি সংস্কারে ২৩ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে, তবে দুর্নীতির কারণে কাজের মান নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (এসই, বগুড়া সার্কেল) সাদেকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ, উন্নয়ন ও মেরামতকাজ দিয়ে অর্ধেক টাকা নেন। এ নিয়ে সম্প্রতি একটি অভিযোগ গেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে।

দুদকে জমা পড়া অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান চালায় কালের কণ্ঠ। গত এক মাসের সরেজমিন অনুসন্ধানে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া গেছে।

বগুড়া প্রথম বাইপাস মহাসড়কে ওভারলে (৫০ মিলিমিটার প্রলেপ) করা হয় সাত কোটি ৪২ লাখ ৮০ হাজার ৮৫৬ টাকায়। কাজ দেওয়া হয় রাজশাহীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স প্যারাডাইস ট্রেডার্সকে।

এই প্রতিষ্ঠানের মালিক হারুন এসইর বন্ধু। ২০১৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম বাইপাস মহাসড়কে ডিবিএস (ড্রেন্স বিটুমিনাস কার্পেটিং) ওয়েরিং কোর্স (পিরিওডিক মেইনটেন্যান্স প্রগ্রাম রোড) কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় সাত ঠিকাদার। ১০ শতাংশ কমে এই কাজে অন্য সবাই একই দর দিলেও তিনি তাঁর পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেন। এ প্রক্রিয়ায় বগুড়া সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত গাইবান্ধা-রংপুর-দিনাজপুর সড়কে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মেরামতকাজ দেওয়া হয় প্যারাডাইস ট্রেডার্সকে। এই কাজ চলছে। সরেজমিনে মেরামতকাজের কোনো নমুনা দেখা যায়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প সহায়তাকারী আতোয়ার বলেন, ‘কাজ করা হয়েছিল। বৃষ্টির কারণে সেগুলো উঠে গেছে।’

সাড়ে সাত কোটি টাকার কাজে বগুড়া প্রথম বাইপাস মহাসড়কে ওভারলে করার কথা থাকলেও ডিবিএস ওয়েরিং কোর্স ৪০-৪২ মিলিমিটার করা হয়েছে। নিম্নমানের কাজ ছয় মাস না যেতে শতকরা ৪০ ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে। সরেজমিন দেখা গেছে, অনেক স্থানে রাস্তা দেবে ঝুঁকিপূর্ণভাবে অন্য পাশ উঁচু হয়ে গেছে। কার্পেটিং উঠে সড়কের নিচের অংশ বের হয়েছে। কোনো কোনো স্থানে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। এর মধ্যে নিম্নমানের কাজের উল্লেখযোগ্য অংশ হলো বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজের সামনে, জাহাঙ্গিরাবাদ ক্যান্টনমেন্টের সামনে, চারমাথা, তিনমাথা ও মাটিডালি মোড়। নিয়ম অনুসারে কাজ না করা, রাতে কার্পেটিং, বৃষ্টির মধ্যে কাজ চালিয়ে যাওয়ায় প্রতিবাদ করেন বগুড়ার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) নজরুল ইসলাম। এ কারণে তাঁকে বগুড়া থেকে নাটোরে বদলি করেন এসই। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় সেকশন কর্মকর্তা (এসও) এনামুল হককে ঠাকুরগাঁওয়ে বদলি করা হয়। এনামুল বলেন, ‘দুর্নীতিপরায়ণ এসই থাকলে এখানে অর্থ খরচ হবে ঠিকই, তা যাবে তাদের পেটে।’

অভিযোগে জানা গেছে, সাড়ে সাত কোটি টাকার বগুড়া প্রথম বাইপাস মহাসড়ক সংস্কারে যে কাজগুলো ধরা ছিল, তা সম্পূর্ণ না করে টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া হয়। অ্যাগ্রিগেট বেস টাইপ ১ (আশি ভাগ পাথর, বিশ ভাগ বালু), রিপেয়ার পোর্ট হোলস (গর্ত মেরামত করে প্রলেপ), এক্সিজটিং পেভমেন্ট সোল্ডার্স (ফুটপাত পাকাকরণ), কনস্ট্রাকশন অব সয়েল আরদেন সোল্ডার (বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন নিয়মিতকরণ), ব্রিক অন এজিং (পাড় ইট দিয়ে খাড়াকরণ), প্রাইমার সিল (ফাটল দূরকরণ), সিল্ক পোস্ট, ট্রাফিক সাইনসহ ১৪ ধরনের কাজ ছিল।

অন্যদিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বগুড়া, জয়পুরহাট ও গাইবান্ধার পিরিওডিক মেইনটেন্যান্সের কাজগুলো ১৫ লাখ থেকে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত এসও এবং এসডিই পাসের জন্য পাঠান এসইর কাছে। এসই এর মধ্যে সসার ড্রেন (চিকন ড্রেন) এবং অতিরিক্ত টেস্ট ঢুকিয়ে দিয়ে কাজের হিসাব গোপন রাখেন। নিয়ম অনুসারে যে ঠিকাদার ১০ শতাংশ মিলিয়ে দরপত্র জমা দেবে কাজ তাকে দেওয়া হবে। এই সুযোগে এসই তাঁর পছন্দের লোককে গোপন হিসাবটি ছোট্ট স্লিপে লিখে দেন। যার কারণে ওই ঠিকাদার ১০ শতাংশ মিলিয়ে দরপত্র জমা দেন। ৫০ শতাংশ ঘুষের শর্তে কাজ দেওয়া হয়।

বগুড়ার ধুনটের নাংলু, বালিয়াদীঘি, পাঁচমাইল ও গাবতলী চৌকিরঘাট সড়ক যথাক্রমে ১৩ কিলোমিটার, ১৪ কিলোমিটার, ১৫ কিলোমিটার ও ১৬ কিলোমিটার কার্পেটিং করা হয়েছে। এর বিল উত্তোলন করেছে মেসার্স এমদাদুল হক। এই প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ করেন ঠিকাদারের ভাতিজা রানা। কাজ ছিল ১৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকার। সওজের এই ঠিকাদার বগুড়া জেলা জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। কাজটি করা হয় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। গত জুনে চূড়ান্ত বিল দেওয়া হয়। ধুনটের নাংলুর বাসিন্দা আবুল কাশেম ফকির জানান, বিগত দুই বছরে এই সড়কে কোনো মেরামত বা নতুন কাজ হয়নি। সড়কের ভাঙা অবস্থাও এই কথা প্রমাণ করে। গাবতলীর চৌকিরঘাটের গৃহবধূ মর্জিনা বেগম ও বেসরকারি সংস্থার কর্মী সাদেক আলী বলেন, ‘সড়কে কোনো কাজ দেখিনি।’ এখানে কোনো কাজের বরাদ্দ হয়েছে, সেই তথ্যও তাঁদের জানা নেই। শিবগঞ্জের রহবলে ভাঙা রাস্তা মেরামত করার জন্য ২৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কাজ শেষ পর্যায়ে। কিন্তু রাস্তা টিকছে না।

সওজ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, গত বছরের জুনে বিল দেওয়া কাজের মধ্যে ছিল সড়কগুলোতে ১২ মিলিমিটার কার্পেটিং সিলকোট ও ভাঙা অংশ মেরামত। শুধু কাগজে-কলমে প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। বাস্তবে কোনো কাজ না করে ঠিকাদার এবং এসই মিলে পুরো টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন। জানতে চাইলে ঠিকাদার এমদাদুল হক জানান, তিনি এই কাজ করেননি। তাঁর প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক অথবা অন্য কেউ কাজটি করে থাকতে পারে। এসব ছোটখাটো কাজ তিনি করেন না। অনুসন্ধানের তথ্য অনুসারে, এসইর অধীনে বগুড়া সড়ক বিভাগ, গাইবান্ধা ও জয়পুরহাটে কমপক্ষে আরো ১০টি কাজ রয়েছে, টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে।

বগুড়া দ্বিতীয় বাইপাসে ১১ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার ৪৬৭ টাকার কাজ। ডিবিএস ওয়েরিং কোর্স এবং ডিবিএসটি। ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কাজ দেওয়া হয় মেসার্স প্যারাডাইস ট্রেডার্সকে। এই কাজে বগুড়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাসুমা বেগম ৫১ লাখ টাকা কমে দরপত্র জমা দেওয়ার পরও তাঁকে কাজ দেওয়া হয়নি।

বগুড়া মাটিডালি বনানী রাস্তা ডিবিএস ওয়েরিং কোর্স, বগুড়া-নওগাঁ-মহাদেবপুর-পত্নীতলা-ধামুরহাট-জয়পুর এবং বগুড়া-সারিয়াকান্দি সড়ক মিলে একটি প্যাকেজ করে গত ৬ নভেম্বর একটি দরপত্র ডাকা হয়। ১৮ কোটি ৯২ লাখ ৯৬ হাজার ১৩৬ টাকার এই কাজ দেওয়া হয়েছে খুলনার মোজাহার এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেডকে। এই কাজে বগুড়া অংশে ১৪ কোটি টাকার কাজ হলেও বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলীকে পিএম (প্রকল্প ব্যবস্থাপক) না করে জয়পুরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলীকে পিএম করা হয়। সড়ক বিভাগে প্রচলিত, জয়পুরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী এসইর কাছের মানুষ।

দুদকের কাছে করা অভিযোগে বগুড়া শহরের কানুছগাড়ির বাসিন্দা মোহাম্মদ সজিব জানান, গত জুনে এসইর বন্ধু বগুড়ার তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমানে দিনাজপুরের এসই) আব্দুল হালিম যোগসাজশ করে সয়েল টেস্ট, সাইন সিগন্যাল, স্টেশনারি মালামাল কেনার নামে সরকারি টাকা উত্তোলন করে নিয়েছেন। মহাস্থান সেতুর দরপত্রে ২.২৫ কোটি টাকার কাজ, সেখানে ৯ কোটি টাকা টার্নওভার চেয়ে দরপত্র করা হয়েছে। গত অর্থবছরে এসইর নির্দেশে বগুড়া মহাসড়কে সাত কোটি টাকার মেইনটেন্যান্স কাজ করা হয়েছে। যার কোনো চিহ্ন এখন নেই।

নাজুক সড়ক বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়ার জেলা প্রশাসক নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। এতে করে মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি দুর্ঘটনা বাড়ছে। সড়ক বিভাগের দ্রত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

অভিযুক্ত এসই সাদেকুল ইসলাম জানান, তিনি কোনো ভাগ-বাটোয়ারার সঙ্গে জড়িত নন। নিয়ম অনুসারে প্রতিটি কাজ দেওয়া হয়েছে। আর রাজনৈতিক বিবেচনায় কিছু কাজ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অনিয়ম ইচ্ছে না থাকলেও করতে হয়। সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ স্বীকার করে বলেন, ‘আমি শুনেছি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। কারা করেছে, কে করেছে, তা জানি না। তবে কাজ করে যাচ্ছি। ঠিকাদাররা যোগ্যতা বিবেচনায় কাজ পেয়েছে। মহাসড়কে গাড়ির চাপ অনেক বেশি। এ কারণে সঠিকভাবে কাজ করা যায় না।’

দুদক বগুড়ার উপপরিচালক আনোয়ারুল হক অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।



মন্তব্য