kalerkantho


ট্রেনের টিকিট কালোবাজারে

রাজশাহীতে রেল কর্মচারীরা বেপরোয়া

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ট্রেনের টিকিট কালোবাজারে

গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টা। রাজশাহী রেলস্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন অন্তত ৪০ জন। তাদের উদ্দেশ্য, রাজশাহী থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করা। কিন্তু দুই-একজন ছাড়া বাকি ২ ও ৪ নম্বর কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে একেকজন একেক দিনের ঢাকাগামী ট্রেনের টিকিটের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। প্রায় সবার মুখে হতাশা। অধিকাংশ কাউন্টারের সামনে থেকে টিকিট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন।

তবে হাতে গোনা দুই-একজনকে টিকিট নিয়ে ফিরতে দেখা যায়। যাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিচিতজন। ফলে তাঁদের সুপারিশে টিকিট নিয়ে ফিরতে পারেন তাঁরা। এমন দৃশ্য শুধু গতকাল শুক্রবারের নয়। প্রত্যেকটি দিন ট্রেনের টিকিট নিতে এসে ঘুরে যেতে হচ্ছে শত শত যাত্রীকে। কিন্তু রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিচিতজনরা ঠিকই পাচ্ছেন টিকিট। আবার কেউবা কালোবাজার থেকে সংগ্রহ করছেন টিকিট। ফলে কাউন্টার থেকে যাত্রীদের জন্য টিকিট বিক্রি হচ্ছে যৎসামান্য।

১২ জানুয়ারির দুটি সাধারণ চেয়ারের টিকিট নিতে গতকাল এসেছিলেন তানোর উপজেলার মুণ্ডুমালা গ্রামের যুবক নুর ইসলাম। তাঁর অসুস্থ বাবাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাবেন। কাউন্টারে কাউন্টারে ঘুরে কোথাও পেলেন না তিনি দুটি টিকিট।

একই সময়ে ১১ জানুয়ারির চারটি টিকিট নিতে এসেছিলেন পুঠিয়া উপজেলার মুনসুর আলী। তিনিও টিকিট না পেয়ে খালি হাতে চলে যান।

তবে ভাগ্যবান এক যুবককে দেখা গেল, ১৩ জানুয়ারির দুটি এসি চেয়ারের টিকিট নিয়ে চলে যেতে। কাছে গিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে আমার এক পরিচিত লোক আছে। তার মাধ্যমে টিকিট দুটি পেয়েছি। না হলে পেতাম না।’

সামিউল হাসান নামের ওই যুবক বলেন, ‘আমিও এভাবে কয়েক দিন টিকিটের জন্য এসে খালি হাতে বাড়ি গেছি। এখন আর টিকিট নিতে সময়মতো না এলেও চলে। পরিচিত ওই ব্যক্তিকে আগে ফোন করে দিই। তিনিই টিকিটের ব্যবস্থা করে রাখেন। পরে যেকেনো সময় এসে কাউন্টার থেকে নিয়ে যাই।’

রাজশাহী নগরীর হেতেম খাঁর বাসিন্দা জুনাইয়েদ হোসেন বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে তিনটি সাধারণ চেয়ারের টিকিটের জন্য ঘুরেছি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। শেষে রেলওয়ের একজন কর্মচারীকে ধরে ওই টিকিটের ব্যবস্থা করি। তবে টিকিটের জন্য তাঁকে কিছু বাড়তি টাকা দিতে হয়েছে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন রাজশাহী রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কয়েকজন বুকিং সহকারী, রেলওয়ের গেটকিপার, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা। যাদের হাত ধরে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী প্রতিদিন যাতায়াতকারী তিনটি ট্রেনের অধিকাংশ টিকিট চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের হাতে। সম্প্রতি ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি নিয়ে কালের কণ্ঠে একটি অনুসন্ধানী খবর প্রকাশের পর সিয়াম নামের এক বুকিং সহকারীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু তার পরেও এই ঘটনা থেমে নেই। বরং দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে বলে দাবি করেন টিকিটপ্রত্যাশী ভুক্তভোগীরা।

রেলওয়ের কয়েকজন বুকিং সহকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী ট্রেনের এসি বাথ, এসি চেয়ার ও এসি কেবিনের টিকিট কালোবাজারি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। সাধারণ চেয়ারের টিকিটও চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের হাতে। কালোবাজারির তালিকায় স্থানীয় কয়েকজন যুবলীগ, আওয়ামী লীগ, যুবদল এবং বিএনপি নেতাকর্মী জড়িত বলে জানা গেছে।

রাজশাহী স্টেশনের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, রাজশাহী-ঢাকা পথে প্রতিদিন তিনটি ট্রেন চলাচল করে। এই তিনটি ট্রেনের প্রায় তিন হাজার টিকিটের মধ্যে অন্তত দেড় হাজার টিকিট চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের হাতে। বাকি দেড় হাজারের মধ্যে প্রায় এক হাজার যাচ্ছে সরকারদলীয় এমপি-মন্ত্রী থেকে শুরু করে স্থানীয় নেতাদের কোটায়। আর প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০০ টিকিট পাচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। তিনটি ট্রেনের টিকিট অন্তত ৯ দিন আগে থেকে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী স্টেশনের তত্ত্বাবধায়ক জিয়াউল হক বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমার কাছে নেই। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। বুকিং সহকারীদের কেউ এই ধরনের কাজে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



মন্তব্য