kalerkantho


যে যা পারছে দখলে নিচ্ছে

টঙ্গীর দত্তপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র

মো. মাহবুবুল আলম, টঙ্গী (গাজীপুর)   

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জয়নাল আবেদীন মোল্লা দত্তপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে ১ নম্বর ব্লকে মসজিদ মার্কেটে পাঁচটি দোকানের মালিক। দোকানগুলো তিনি বিক্রি করবেন ১০ লাখ টাকা করে। ২ নম্বর ব্লকের রাস্তার পাশেই ব্যবসায়ী শাহিন রহমান তৈরি করেছেন সিরামিক ইটের তিনতলা বাড়ি। নিচে মার্কেট, ওপরে আবাসিক ফ্ল্যাট। এমনই বিত্তশালী লোকেরা টঙ্গীর এরশাদনগর দত্তপাড়া বাস্তুহারা পুনর্বাসন কেন্দ্রের ছিন্নমূল মানুষের জায়গাজমি দখলে নিয়ে অবাধে বিক্রি করছে। এভাবে নিঃস্ব, অসহায় লোকদের আবাসস্থল ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে বিত্তশালী মানুষদের হাতে, যা দেখার কেউ নেই।

১৯৭৫ সালে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চার হাজার ৪৪৪টি অসহায় ছিন্নমূল পরিবারকে দত্তপাড়ায় ১০১ একর অব্যবহৃত তৎকালীন ডিআইটির হুকুমদখল করা জমিতে এনে ঠাঁই দিয়ে পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপিত হয়। পুনর্বাসন কেন্দ্রের জমি সমবণ্টন ও এলাকার উন্নয়নে ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছর থেকে চার বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপের প্রতি লক্ষ রেখে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টির জন্য পূর্ত মন্ত্রণালয়ের গৃহসংস্থান অধিদপ্তর এ এলাকার আবাসিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে তিন হাজার ৭৬ দশমিক ৭০ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পরিকল্পনা অনুসারে এখানে দুই কক্ষ, বাথরুম ও রান্নাঘর সংবলিত ৬০০ বর্গফুটের চার হাজার ইউনিট নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরে ৮৩ লাখ টাকা এবং ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে ৪২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে এক হাজার ৬১টি ইউনিটের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকল্পের কাজ স্থগিত হয়ে যায়। নির্মিত এসব সেমিপাকা বাড়ি স্বল্প আয়ের লোকদের মাঝে ৯৭ হাজার টাকায় ১৫ বছর মেয়াদি কিস্তিতে স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেওয়ার কথা। কিন্তু নির্মিত বাড়িগুলো বিদ্যুৎ ও গ্যাস-পানি সংযোগ দেওয়ার আগেই দখলদাররা তা দখল করে অবাধে বেচাকেনা করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় অর্ধেক বাড়ি চার-পাঁচ লাখ টাকা করে কয়েকবার বিক্রি হয়ে হাতবদল হয়েছে। এখানে যারা বসবাস করছে তাদের বেশির ভাগই এখন বিত্তশালী। তারা জমি, বাড়ি দখল করে ও কিনে সেগুলো ভাড়ায় চালাচ্ছে। সরেজমিনে গিয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনা এখানে ওপেন সিক্রেট। ৩ নম্বর ব্লকে ১৩০ নম্বর প্লটে দুই কাঠা জমির ওপর তৈরি একটি বাড়ি একসময় দখলি সূত্রে ভোগ করতেন হারুন অর রশিদ। এখন সিরাজুল ইসলাম নামের এক বাঁশ ব্যবসায়ী জমিটি কিনে নিয়েছেন ছয় লাখ টাকায়। জমি বিক্রি করতে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, এখানে তার কিছুই করা হয়নি। কেবল ১০০ অথবা ৫০০ টাকার একটি স্ট্যাম্পে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তিকে সাক্ষী রেখে জমি হাতবদল হয় মাত্র। বর্তমান বাজারদরে এই জমির আনুমানিক মূল্য ২৫ লাখ টাকা থাকলেও হাতবদল হয় মাত্র পাঁচ লাখ থেকে সাত লাখ টাকায়। এর কারণ এটি সরকারি সম্পত্তি। বরাদ্দ হওয়ার আগেই কিছু লোক এসব বাড়িঘর ও জমিতে উঠে তা নিজেদের দখলে নেয়। তাদের কাছ থেকে অল্প দামে প্রভাবশালী লোকেরা তা কিনে নিচ্ছে। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন জমি বিক্রির এই অবাধ বাণিজ্য সম্পর্কে জেনেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যে দু-একটি পাকা বাড়ি উচ্ছেদের জন্য নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব সম্পন্ন করে। পুনর্বাসনকেন্দ্রটি এখন যেন ‘মগের মুল্লুক’। কার সম্পত্তি কে বেচে এর কোনো হিসাব নেই। পুনর্বাসনকেন্দ্রের ৩ নম্বর ব্লকের আবুল হাসান জানান, ১ নম্বর ব্লকের শাহানুর মিয়া যে বাড়িতে বসবাস করছেন, তা দেড় লাখ টাকায় কিনেছিলেন কতবানুর কাছ থেকে। ২ নম্বর ব্লকের চুন্নু মিয়ার বাড়িটি বেশ কয়েকবার বিক্রি হয়েছে। বাড়িটি এখন পাঁচ হাজার টাকায় ভাড়া চলছে। ৩ নম্বর ব্লকের সারোয়ার মিয়ার বাড়িটি আড়াই লাখ টাকায় কেনা। আদম আলী নামে একজন তা বিক্রি করে দেন। ৩ নম্বর ব্লকের শামসু মিয়ার কাছ থেকে দুই লাখ টাকায় একটি বাড়ি কিনেছেন আরফাত নেছা। ৫ নম্বর ব্লকের সফিক মিয়া দুই লাখ ৬০ হাজার টাকায় কান্দু বেপারীর বাড়িটি কিনেছেন। এ ছাড়া ১ নম্বর থেকে ৮ নম্বর ব্লক পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ড্রেনের ওপর গড়ে উঠেছে প্রায় দেড় হাজার দোকানপাট। এসব দোকান ও ভিটি বিক্রি হচ্ছে পাঁচ-ছয় লাখ টাকায়। পুনর্বাসনকেন্দ্রের নানা স্থানে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। এসব ভবনের নেই কোনো নকশা। ১০ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকায় এসব ভবন বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয় লোকজন জানায়, যে যেভাবে পেরেছে জমি দখলে নিয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ বলেন, দোকান ভিটি বেচাকেনা ও জমি এবং বাড়ি বেচাকেনা এখানকার বড় ব্যবসা। গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ এলাকার ৩৩ একর জমিতে সরকারি আবাসিক প্লট হিসেবে ব্যবহার করলেও অবশিষ্ট জমি যে যেভাবে পেরেছে দখল করে নিয়েছে। পুনর্বাসনকেন্দ্রে বর্তমানে যেসব দরিদ্র লোক বসবাস করছে তাদের বেশির ভাগই ভাড়াটে। দেড় হাজার থেকে চার হাজার টাকায় এখানে বাড়িভাড়া পাওয়া যায়। ভাড়াটে পোশাক কর্মী আলেয়া বেগম জানান, কম ভাড়ায় থাকা যায় বলে অনেক ভিক্ষুক, রিকশা ও ভ্যানচালক এবং শ্রমিকরা এখানে ভাড়ায় থাকে। পুনর্বাসনকেন্দ্রের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, সরকার যে বাড়িগুলো তৈরি করেছিল, তা এখন অনেকে ভেঙে নিজের প্রয়োজনমতো বড় করে নিচ্ছে। কেউ একতলা ভেঙে তিন-চারতলা বাড়ি তৈরি করেছে। কেউ রান্নাঘর ভেঙে আরো বড় করেছে। অনেকে স্থানীয় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের ভয়ে নামমাত্র দামে প্লট বিক্রি করে এখান থেকে চলে গেছে। সংশ্লিষ্ট পৌর ওয়ার্ড কাউন্সিলর বাদল মিয়া বলেন, পুনর্বাসনকেন্দ্রটি মূলত দরিদ্র ছিন্নমূল মানুষের জন্য। কিছু ধনী লোক এখানে জমি কিনেছে। কিন্তু এই বেচাকেনা বন্ধ করার ব্যাপারে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কোনো এখতিয়ার নেই। সিটি করপোরেশন শুধু উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে কাজ করে। পুনর্বাসনকেন্দ্রে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের অফিস ঘরটি এখন আবাসিক ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পুনর্বাসনকেন্দ্রের অনেক জমি ও বাড়ির মালিকরা অন্যত্র বাড়ি করে এগুলো ভাড়ায় খাটাচ্ছেন।

পুনর্বাসনকেন্দ্রের জমি দখল, বেচাকেনা ও অবৈধভাবে বহুতল ভবন তৈরির বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শাখাওয়াত হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দত্তপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রটি ছিন্নমূল মানুষের জন্য নির্ধারিত। তবে এ এলাকায় অনেক বিত্তশালী ব্যক্তি জমি দখল করে অথবা কিনে অবৈধভাবে ভবন তৈরি করে ব্যবসা করছেন। আমরা এ ব্যাপারে তাঁদের নোটিশ দেব। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে বেশ কিছু দখলদারকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।’



মন্তব্য