kalerkantho

সেতাফুলে কাঁটা

কিশোরগঞ্জের রাঘব বোয়াল ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সেতাফুলে কাঁটা

সেতাফুল ইসলাম

ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা (এলএও) মো. সেতাফুল ইসলাম পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আরো ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের আয়োজন করেছিলেন। ধরা পড়ায় চেক আটকে দিয়েছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি)। স্থানীয় লোকজন মনে করছে, জেলা প্রশাসনে এত বড় দুর্নীতির কথা এর আগে শোনা যায়নি।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব মো. শাফায়াত মাহবুব চৌধুরীর ২৮ নভেম্বর পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সেতাফুল জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত পাঁচ কোটি টাকার একটি চেক নিয়ে ৬ ডিসেম্বর ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কর্মচারীদের বেতন-ভাতার নামে খোলা সোনালী ব্যাংকের চলতি হিসাবে জমা করেন। এ হিসাব নম্বর থেকে এই দিন তিনি দুই কোটি টাকা এবং পরদিন দুই কোটি ৯৪ লাখ টাকা তোলেন। বাকি ছয় লাখ টাকা তপন ইন্ডাস্ট্রিজের নামে পাঠান তিনি। উপসচিবের চিঠির শেষে মন্তব্য করা হয়েছে, ‘অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত। এ অবস্থায় এই কর্মকর্তা যাতে দেশের বাইরে চলে যেতে না পারেন, সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।’

এ ছাড়া আরেক চিঠিতে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে মামলা করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকেও আরেকটি চিঠি দেওয়া হয়েছে।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মিঠামইন উপজেলায় সেনানিবাস স্থাপন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ আসে। যে খাত থেকে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কাছ থেকে পাঁচ কোটি টাকার চেক চাওয়া হয়, সেই খাতে সাড়ে চার কোটি টাকা ছিল। পরে অন্য খাত থেকে আরো ৫০ লাখ টাকা এনে সমন্বয় করে হিসাব বিভাগ থেকে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার নামে চেক দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে এই অনিয়মে জেলা হিসাব বিভাগের জড়িত থাকার প্রশ্ন উঠেছে।

তবে জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের নিরীক্ষক (অডিটর) মো. সৈয়দুজ্জামান খাতের নাম উল্লেখ না করে বলেন, ‘এ কথা সত্য নয়। এ খাতে অনেক বেশি টাকা ছিল। এ কারণে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার পরামর্শ মতে চেক ইস্যু সম্ভব হয়েছে।’

এ বিষয়ে জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, বিষয়টি নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে। তাই বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। তাঁর কাছে প্রশ্ন ছিল, জমি অধিগ্রহণের টাকার চেক কেন কর্মকর্তার নামে? যাঁর জমি, তাঁর নামে নয় কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এ প্রশ্ন আমিও তুলেছিলাম। পরে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা অফিস আদেশ তৈরি করে আমাদের কাছে দেন। ওই অফিস আদেশ মেনে তাঁর নামে চেক দেওয়া হয়।’ এই দুর্নীতিতে তিনি ও তাঁর অফিস জড়িত কি না—প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি ও আমার অফিসের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’

তবে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হিসাব বিভাগের সহযোগিতা ছাড়া এ কাজ কখনো সম্ভব নয়। কারণ নিয়মের মধ্যে ফেলে কিভাবে টাকা আত্মসাৎ করা যায়, তার পথ এ বিভাগই শিখিয়ে দিয়েছে।’

এদিকে ঘটনা তদন্তের জন্য ডিসির নির্দেশে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি এক সদস্যের, অন্যটি তিন সদস্যের। একটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দুলাল চন্দ্র সূত্রধর জানান, তিনি একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। আরো একটি তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, ‘তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক জহিরুল ইসলাম। সেই কমিটি এক মাসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেবে।’

জমা পড়া তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিটি এলএ (জমি অধিগ্রহণ) কেসের বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির নামে আলাদা চেক ইস্যু হওয়ার কথা। কিন্তু এ কর্মকর্তা নিজের নামে চেক করিয়েছেন। ইস্যু করা চেকের সঙ্গে কেস নথি, রেজিস্ট্রার, লেজার বই ইত্যাদিতে গরমিল রয়েছে। এমনকি হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার স্থিতির সঙ্গে এলএ কেস নম্বরের লেজার বইয়ের গরমিল পাওয়া গেছে। এর বাইরে আরো ৬১টি চেকের আট কোটি ৯ লাখ ৭০ হাজার টাকার সুস্পষ্ট গরমিল পাওয়া যায়। তদন্ত প্রতিবেদনে ডিসির কাছে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়।

সোনালী ব্যাংক কিশোরগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. মাহবুবুল ইসলাম খান বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা নিজের গাড়ি ও পুলিশ পাহারায় টাকা তুলে নিয়ে গেছেন। একজন বড় কর্মকর্তা এলে সেখানে আর সন্দেহ থাকে না। এ কারণে ডিসিকে বিষয়টি জানানোর প্রয়োজন মনে করিনি।’

এদিকে গত ৩ ডিসেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন, অধিশাখা-২-এর উপসচিব মো. মনিরুজ্জামান মিঞা স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে কিশোরগঞ্জ জেলা অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সেতাফুল ইসলামকে একই পদে পিরোজপুর জেলা প্রশাসনে বদলি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে তাঁকে কিশোরগঞ্জ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছেন ৬ ডিসেম্বর। ভূমি অধিগ্রহণ কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, সোনালী ব্যাংক থেকে ওঠানো টাকা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা কিশোরগঞ্জ শহরের অন্য একটি ব্যাংকে জমা করেছেন। পিরোজপুরে কর্মরত সেতাফুল ইসলামের মোবাইল ফোনে কল করে বন্ধ পাওয়া গেছে। এ কারণে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

কিশোরগঞ্জের ডিসি মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ও জড়িত রয়েছে বলে তদন্তে আভাস পাওয়া গেছে1



মন্তব্য