kalerkantho


চারদিকে কোচিংয়ের জাল

সরিষাবাড়ীতে মানা হচ্ছে না নীতিমালা, ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন

জামালপুর প্রতিনিধি   

৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জামালপুরের সরিষাবাড়ী পৌর এলাকাসহ উপজেলার আটটি ইউনিয়নেই নীতিমালা লঙ্ঘন করে চলছে রমরমা কোচিং বাণিজ্য। ব্যক্তিমালিকানায় নামে-বেনামে কোচিং সেন্টার গড়ে ওঠার পাশাপাশি সরকার অনুমোদিত ও এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়গুলোতেও চলছে এই বাণিজ্য। এসবের সঙ্গে সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা প্রকাশ্যে জড়িত থাকলেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না স্থানীয় প্রশাসন।

সরিষাবাড়ী পৌর এলাকার টিঅ্যান্ডটি অফিসসংলগ্ন ‘একটেল কোচিং সেন্টারে’ গিয়ে জানা গেছে, এমপিওভুক্ত কয়েকজন শিক্ষক এখানে নিয়মিত ক্লাস নেন। ফরহাদ আলী ডিগ্রি কলেজের রসায়নের প্রভাষক এ কে এম সামছুল আলম আজম নিজেই একটেল কোচিং সেন্টারের পরিচালক ও নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের রসায়নের ক্লাস নেন। সরিষাবাড়ী অনার্স কলেজের প্রভাষক রফিকুল ইসলাম এখানে ক্লাস নেন পদার্থবিজ্ঞানের। মির্জা আজম কলেজের প্রভাষক আব্দুল লতিফ ও মনিরুজ্জামান মনি যথাক্রমে বাংলা ও সমাজবিজ্ঞানের ক্লাস নেন ওই কোচিংয়ে। এ ব্যাপারে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাঁরা রাজি হননি। তবে সামছুল আলম আজমের সঙ্গে অভিভাবক পরিচয়ে ফোন করলে তিনিসহ এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কোচিংয়ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং সন্তানকে ভর্তি করাতে অনুরোধ জানান। পরে সাংবাদিক পরিচয়ে জানতে চাইলে মুঠোফোনে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আগে অনেকেই এখানে জড়িত ছিলাম, এখন নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে বসে একসময় খোলামেলা কথা বলব।’

আরামনগর বাজারের প্রাইম কোচিং সেন্টারের পরিচালক রৌহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসমাইল হোসেন। এখানে নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উচ্চতর গণিতের ক্লাস নেন ডিগ্রিবন্ধ মাদরাসার শিক্ষক আব্দুল করিম। ইউরিকা কোচিং সেন্টারে উচ্চতর গণিতের ক্লাস নেন সেঙ্গুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোজাফ্ফর হোসেন। প্রাইমের পরিচালক ইসমাইল হোসেন এ ব্যাপারে বলেন, ‘আমাকে সবাই জানলেও আমার স্ত্রীই কোচিংটি চালান।’

পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ভালো ফল ও কোচিংমুখী করতে কোনো কোনো কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে উপজেলা শিক্ষা অফিসের সঙ্গে যোগসাজশে সাময়িক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা পোস্ট অফিস রোডের ইউরিকা কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড ক্যাডেট কোচিং সেন্টার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গত বছরের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে। তারা পঞ্চম শ্রেণির বাংলা প্রশ্নপত্র নিয়ে শিক্ষা অফিস নির্ধারিত রুটিনের আগেই সাপ্তাহিক পরীক্ষার নামে মডেল টেস্ট নিলে বিষয়টি অভিভাবকদের নজরে আসে। পরে উপজেলা শিক্ষা অফিস ওই কিন্ডারগার্টেনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। তবে পরে তা ধামাচাপা পড়ে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আহসান হাবীব লাভলু অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘বিষয়টি কাকতালীয়ভাবে মিলে গিয়েছিল।’

বিভিন্ন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পরীক্ষায় ভালো ফলের নামে কোচিং ক্লাস করানো হচ্ছে। ম্যানেজিং কমিটির যোগসাজশে সংশিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকরা কোচিংয়ের নামে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। বিনা রসিদে এই টাকা নেওয়া হলেও নিরুপায় শিক্ষার্থীরা। পৌর এলাকার আরডিএম পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, বাউসি বাঙ্গালী উচ্চ বিদ্যালয়, পোগলদিঘা ইউনিয়নের বয়ড়া ইসরাইল আহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়, রুদ্র বয়ড়া উচ্চ বিদ্যালয়সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ঘুরে জানা যায়, শ্রেণিভেদে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত কোচিং ফি আদায় করা হচ্ছে রসিদ দেওয়া ছাড়াই। বাউসি বাঙ্গালী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, এ প্রতিষ্ঠানে অষ্টম ও দশম শ্রেণিতে কোচিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতি শ্রেণিতে গাদাগাদি করে ৪০-৫০ জন একসঙ্গে পড়ানো হয়। কোচিংয়ে অংশ না নিলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়াসহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। বয়ড়া ইসরাইল আহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ে কোচিংয়ের পরিচালক মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তেই কোচিং করানো হয়।’ বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ফি আদায়ের রসিদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

শিক্ষাবিষয়ক গবেষক সরকার আবুল হোসেন, সচেতনমহল ও অভিভাবকদের অভিযোগ, কিন্ডারগার্টেন ও কোচিং সেন্টারগুলো লাগামহীনভাবে টিউশন ফি আদায় করছে। বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে উেকাচ নিয়ে তারা শিশুশিক্ষার্থীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে বইয়ের বোঝা। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। আবার এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা কোচিং সেন্টারে খণ্ড বা পূর্ণকালীন ক্লাস নেন। তাঁরা শিক্ষার্থীদের নম্বর কম দেওয়ার ভয় দেখিয়ে কোচিংমুখী হতে বাধ্য করছেন। এতে সরকার অনুমোদিত বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাচ্ছে।

সরকার কোচিং বাণিজ্য বন্ধে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন ও কোচিং সেন্টারগুলোর তালিকা, যাচাই-বাছাই ও করণীয় নির্ণয় করতে ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। পরে দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঁচ সদস্যের টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করে মাঠ প্রশাসনকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গত বছরের ১৬ জানুয়ারি চিঠি দেওয়া হয়। তবে এ ব্যাপারে সরিষাবাড়ীতে মাঠ প্রশাসনের উদ্যোগ দেখা যায়নি।

সরিষাবাড়ী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কোচিংয়ে জড়িত থাকা বেআইনি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে উপজেলায় এখনো টাস্কফোর্স কমিটি করা হয়নি; দ্রুত গঠন করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইয়েদ এ জেড মোরশেদ আলী বলেন, ‘এখানে কোচিং সেন্টারের সংখ্যা অনেক, যা একা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। এটা নিয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা হয়েছে। আর টাস্কফোর্স কমিটি গঠনের সরকারি নির্দেশনা এখনো হাতে পাইনি।’

 


মন্তব্য