kalerkantho


দুই সাংবাদিকের নামে ৫৭ ধারায় মামলা

বের হয়ে আসছে বাদী সায়েমের নানা অপকর্ম

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নারায়ণগঞ্জে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা দায়েরকারী আলীরটেক ইউনিয়নের কুড়েরপাড় এলাকার সায়েম আহমেদকে এক যুগ আগেও লোকজন চিনত নুরু মিয়া নামে। বিদ্যালয়েও এই নাম ছিল তাঁর। তবে শহরের বাবুরাইল এলাকার প্রভাবশালী পরিবারে বিয়ের পর নাম পাল্টে বনে যান সায়েম আহমেদ। এরপর আলীরটেক, গোগনগর, কাশীপুর ইউনিয়নে জমির দালালি করে এক যুগে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। ভুয়া দলিল ওয়ারিশনামা বানিয়ে নিরীহ মানুষের জমি দখল করে চড়া দামে অন্যের কাছে বিক্রি করাই তাঁর প্রধান ব্যবসা। তাঁর লোকজনের হাতে জমি হারিয়েছেন কুড়েরপাড়েরই অন্তত ৫০ জন ব্যক্তি। ১১ বছর আগে সায়েমের লোকজনের হাতে গুম হন যুবক রুবেল। রুবেলদের বাড়িও জ্বালিয়ে দিয়েছিল তারা। কুড়েরপাড়ে গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য।

সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগে কুড়েরপাড়ে ধলেশ্বরী নদীর তীরে ভুয়া দলিল ওয়ারিশনামা বানিয়ে নিরীহ অর্ধশত মানুষের কয়েক শ শতাংশ জমি দখলে নেন সায়েম। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, হত্যাচেষ্টা, গুমসহ নানা অভিযোগে অনেক মামলা থাকলেও প্রভাবশালী ওই পরিবারের কারণে রক্ষা পেয়েছেন সায়েম। কুড়েরপাড়ের রাহিমা জানান, তাঁদের তিন একর (৩০০ শতাংশ) জমি দখলে নিয়েছেন সায়েম ও তাঁর লোকজন। ১১ বছর আগে তাঁদের জমি দখলে বাধা দেওয়ায় তাঁর ছেলে রুবেলকে গুম করে সায়েমের লোকজন। পাঁচ বছর আগে সায়েমরা রাহিমাদের জমিতে ড্রেজার লাগিয়ে বালু ভরাট শুরু করলে তাঁরা বাধা দেন। এর জেরে রাহিমাদের বসতবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় সায়েমরা। রাহিমা ও তাঁর ছেলে হাবিবকে বেধড়ক পেটায়। হাসপাতালে নেওয়ার পথেও হাবিবকে পেটানো হয়। পরে সায়েম জমিটি একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে বেচেন। এ নিয়ে রাহিমারা একাধিক মামলা করেও বিচার পাননি। হাবিব জানান, তাঁর খালা তফুন্নেছাকে হত্যার চেষ্টা চালায় সায়েমের লোকজন। সায়েমরা কুড়েরপাড়ের প্রয়াত রফিজউদ্দিনের (৩০০ শতাংশ) এবং মোহাম্মদ আলী ও তাঁর ছেলে শহর আলীর জমিও দখলে নিয়েছে।

কুড়েরপাড়ের আলী আকবর বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন করা সিনহা পিপলস এনার্জি লিমিটেড নামের বিদ্যুেকন্দ্রের পাশেই আমাদের পৈতৃক ১০-১২ পাখি (বিঘা) জমি আছে। কয়েক বছর আগে সায়েমরা জমিটি একটি ইটভাটার মালিকের কাছে বেচে দেয়। বাধা দিলে আমার ছোট ভাই আক্কাসকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তখন আমি তাবলিগ জামাতের চিল্লায় ছিলাম।’ নান্নু মিয়া জানান, তাঁর প্রয়াত নানার ৮৭ শতাংশ জায়গা অন্যত্র বিক্রি করে দেন সায়েম।

এদিকে সায়েম ২০১৬ সালের ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আলীরটেক ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়া, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ও সমাজসেবক পরিচয় দিয়ে পোস্টার সাঁটিয়েছিলেন। পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

সায়েম নিজেকে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, বাংলাদেশ ইয়ান মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (সুতা ব্যবসায়ীদের সংগঠন) ও বাংলাদেশ হোসিয়ারী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে দুই সাংবাদিকের নামে আদালতে মামলা করলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে ওই সব সংগঠনের সদস্য হন তিনি। পরে তাঁর সদস্য পদ বাতিল করা হয়েছে। একটি থান কাপড়ের দোকান ভাড়া নিয়ে নিটিং কারখানার মালিক পরিচয় দিয়ে তিনি সংগঠনগুলোর সদস্য পদ নিয়েছিলেন।

নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল বলেন, ‘চেম্বারের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর সদস্য নবায়ন করতে হয়। সায়েমের নবায়ন সনদ নেই।’

সায়েমের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা ও মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় চাঁদাবাজি, মারামারি, হত্যাচেষ্টা, হত্যার উদ্দেশ্যে গুম ইত্যাদি অভিযোগে বেশি কিছু মামলা আছে এবং একটি মামলায় তিনি জেলও খেটেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ৩ মে গণভবন থেকে উদ্বোধন করেন কুড়েরপাড়ে ৫২ দশমিক ৫ মেগাওয়াটের সিনহা পিপলস এনার্জি লিমিটেডের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের। ১০ মে সিনহা পিপলস এনার্জির সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) শাহাবুদ্দিন আহমেদ নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় জিডিতে বলেন, বিদ্যুেকন্দ্রের নিজস্ব জেটির সামনে সায়েম, কাশেম, শাহ আলম, মো. আলী ৭ মে খালি বার্জ ও লাইটারেজ জাহাজ নোঙর করে রাখেন যাতে বিদ্যুেকন্দ্রের জাহাজ জেটিতে ভিড়তে না পারে। সন্ত্রাসীরা বিদ্যুেকন্দ্রে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও কেন্দ্রে কর্মরত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

সিনহা পিপলস এনার্জির নির্বাহী পরিচালক মামুন হায়দার তখন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, সায়েম প্রথমে নিজের জমি দাবি করে সেসব কম্পানির কাছে বেচতে চান। পরে কম্পানি খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, ভয়ভীতি দেখিয়ে সাধারণ মানুষের জমি কম দামে বায়না করে কয়েকগুণ টাকা নিয়ে কম্পানির নামে রেজিস্ট্রি করছেন। এরপর মানুষজন সরাসরি কম্পানির কাছে জমি বিক্রি করে।

অভিযুক্ত সায়েম আহমেদ বলেন, ‘আমি ওই এলাকায় থাকি না এবং কোনো ধরনের জমি দখলে লিপ্ত নই। অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট।’

সায়েমকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে গত ৩১ ডিসেম্বর নারায়ণঞ্জের ‘নিউজ নারায়ণগঞ্জ২৪ ডটনেট’-এর স্বত্বাধিকারী ও এডিটর ইন চিফ শাহজাহান শামীম এবং নির্বাহী সম্পাদক তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে মামলা করেন সায়েম।



মন্তব্য